১৯ মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ বীরদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন “

 এম এ হানিফ রানা (গাজীপুর):আজ শহীদ নিয়ামত আলী এবং মনু মিয়ার ৫০ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ১৯ মার্চ ১৯৭১ সালে এই দিনে একসাথে শহীদ হোন তারা। এই উপলক্ষ্যে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পক্ষ হতে সহকারী কমিশনার মোঃ ইকবাল হোসেন এবং ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী, সহকারী কমিশনার এবং শহীদদের পরিবারের লোকজন উপস্হিত ছিলেন।

দিনটি ছিলো ১৯ মার্চ ১৯৭১ সাল শুক্রবার। সূর্য তখন মাঝ আকাশ থেকে হেলে যাচ্ছে পশ্চিমের দিকে। চারিদিকে অস্থির সময়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকেই শুরু হতে থাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্রযাত্রা।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালির পক্ষ থেকে গর্জে উঠতে থাকে স্বাধীনতার ডাক। ভাওয়াল রাজবাড়িতে (বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) অবস্থান নেয় দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। এ রেজিমেন্টের ২৫-৩০ জন পশ্চিম পাকিস্তানি। তবে তাদের সংগ দিয়ে যাচ্ছিলেন আরো অসংখ্য বাঙ্গালী অফিসার-সৈনিক এবং পাকিস্তান প্রেমি কিছু মানুষজন।

তখন চারিদিকে চলছিলো স্বাধীনতার জন্য অসহযোগ আন্দোলন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তাও বাঙালিদের চিরতরে দাবিয়ে রাখার জন্য এঁটে যাচ্ছিল একের পর এক ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। এবং করে যাচ্ছিলো বাস্তবায়িত।
সেই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ছিলো সেনানিবাসে অবস্থানরত বাঙালি অফিসার-সৈন্যদের বিচ্ছিন্ন করে কৌশলে তাদের নিরস্ত্র করা।

ঢাকার ব্রিগেড সদর দফতর থেকে নির্দেশ এলো, ১৫ মার্চের মধ্যে রাইফেলগুলো গুলিসহ ব্রিগেড সদর দফতরে জমা দিতে হবে। কিন্তু বাঙালি অফিসার-সৈনিকরা অস্ত্র জমা দিতে অনিচ্ছুক ছিলো।
ওই সময় ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার পাকিস্তানি এক ব্রিগেডিয়ার নিজেই ১৯ মার্চ দুপুরের জয়দেবপুর সেনানিবাসে উপস্থিত হন। এবং পাকিস্তানিদের গোপন কথা প্রকাশ হতেই সকলেই অগ্নিরুপ ধারন করে। বর্ষার আকাশের মত মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টে যায় চিত্র। ১০ হাজারের ও বেশি মুক্তিকামী জনতা জড়ো হয় জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত। ছোট বড়ো মিলিয়ে প্রায় ১৫০ টির মত ব্যারিকেড দিতে সক্ষম হয় ।

পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সেনানিবাসে বসেই এ খবর পান। তিনি ব্যারিকেড অপসারণের নির্দেশ দেন। জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার কে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় ব্যারিকেড সরানো হবে না। এরপর পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সামনে বাঙালি সৈন্য ও পেছনে পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে রওয়ানা হন ঢাকার দিকে। কিন্তু ব্যারিকেডের জন্য এগুতে না পারলে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন । শুরু হয় এলোপাথাড়ি গুলি। সেই গুলিতে শহিদ হোন কিশোর নিয়ামত আলী ও মনু খলিফা। এবং চান্দনা-চৌরাস্তায় পাঞ্জাবি প্রতিরোধকালে হুরমত আলী নামে এক যুবক একজন পাকিস্তানি সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নিয়ে গুলি করতে চেষ্টা করেন। সে সময় অপর একজন পাকিস্তানি সৈন্যের গুলিতে হুরমত আলী শহীদ হন। এ ছাড়া গুলিতে আহত হন ইউসুফ, সন্তোষ ও শাহজাহানসহ আরও অনেকে। এর পরই স্লোগান হয় ‘গাজীপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

পরবর্তীতে জয়দেবপুরের বীর জনতার পথ ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগ্রাম ও বিদ্রোহের দাবানল প্রজ্জলিত হয়ে ওঠে। উত্তাল ১৯ মার্চ কেবলমাত্র এক তারিখ নয় এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক স্বর্নখচিত দিন।
ঢাকা থেকে ৩৫ মাইল উত্তরে জয়দেবপুর চৌরাস্তা। আর এই চৌরাস্তার ওপরই রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গী। একজন মুক্তিযোদ্ধার বাম হাতে ধরা রাইফেল। ডান হাতে একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারতে উদ্যত। ১৮ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্যটি ২২ ফুট উঁচু একটি বেদীর ওপর নির্মিত। ভাস্কর্যটির চারদিক জুড়ে রয়েছে ২০৭ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম।

যারা ১৬ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ৩ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। জাগ্রত চৌরঙ্গী মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্য। এই জয়দেবপুরের জনতা খালি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকবাহিনীর ওপর।
শহীদ নিয়ামত আলীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তার ভাই আলহাজ্ব লিয়াকত আলী ২০১৭ সালে স্থাপিত করেন ” শহীদ নিয়ামত এডুকেশন হোম ” নামে একটি স্কুল। যেখানে অনেকেই শিক্ষা লাভ করছেন।