রাজধানীর গাবতলি থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের আরও দুই সহযোগী গ্রেফতার

এস,এম,মনির হোসেন জীবনঃ রাজধানীর গাবতলি এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত হেলেনা জাহাঙ্গীরের আরও দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

আজ মঙ্গলবার র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদেরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আজ ভোর রাতে রাজধানীর গাবতলি এলাকায় অভিযান চালিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হাজেরা খাতুন (৪০), স্বামীঃ মনিরুল ইসলাম, গ্রাম-এতবার পুর, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা এবং সানাউল্ল্যাহ নূরী (৪৭), পিতা-মৃত শেখ মঈন উদ্দিন, সামন্তপুর, গাজীপুর’কে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাব সূএে জানা যায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের আইপি টিভি জয়যাত্রা টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন হাজেরা খাতুন ও কো-অর্ডিনেটর ছিলেন সানাউল্লাহ নূরী।

এসময় অভিযানে উদ্ধার করা হয় ২টি ল্যাপটপ এবং ২টি মোবাইল। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারস্হ র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এবিষয়ে এক প্রেসকনফারেন্স এর এসব কথা বলেন র‌্যাবের আইনও গনমাধ্যম শাখার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

সংবাদ সম্মেলনে এসময় র‌্যাবের অন্যান্য উধর্বতন কর্মকর্তারা উপস্হিত ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদেরকে জানান, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গের সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত হেলেনা জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হাজেরা খাতুন এবং সানাউল্ল্যাহ নূরীকে রাজধানীর গাবতলী এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাব সাইবার মনিটরিং টিম সক্রিয় রয়েছে। ভাচুর্য়াল জগত ব্যবহারের মাধ্যমে মিথ্যাচার, বিভ্রান্তি ছড়ানো, অপপ্রচার রোধকল্পে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে র্যাব। এলক্ষে র্যাব গত ২৯ জুলাই ২০২১ রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় গোপনে অভিযান চালিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীর (৪৯) কে গ্রেফতার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জাহাঙ্গীর এর প্রতারণার কার্যক্রমের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজনের সম্পর্কে তথ্য পায় এলিট ফোর্স র্যাব। দেশের সকল গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের গ্রেফতারের সংবাদ প্রচারিত হয়। ফলশ্রুতিতে প্রতারিতরা আশান্বিত হয়।

এ প্রেক্ষিতে ভিকটিমরা অভিযোগ দায়ের করতে উৎসাহী হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে। গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন ২০০৯ সালে কুমিল্লার একটি কলেজ থেকে মাষ্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর সে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন মিরপুরে একটি গার্মেন্টস এ্যাডমিন (এইচ আর) পদে চাকুরী শুরু করেন। পরবর্তীতে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নিকট আত্মীয় এবং একই সাথে কর্মদক্ষতা গুনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে উঠেন।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, ২০১৬ সালে তিনি “জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন” এর ডিজিএম হিসেবে নিযুক্তি পান। অতঃপর তিনি “জয়যাত্রা টিভি” প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জিএম (এ্যাডমিন) এর পদে নিযুক্ত হন। গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক বিষয়াদি দেখভাল করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

জয়যাত্রা টিভি সম্পর্কে গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন’কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানান, জয়যাত্রা টিভি ২০১৮ সাল থেকে হংকং এর একটি ডাউন লিংক চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচার হয়ে আসছে। যার ফ্রিকুয়েন্সি হংকং থেকে বরাদ্দ করা হয়েছে। এজন্য ফ্রিকুয়েন্সির জন্য হংকংকে প্রতি মাসে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা পরিশোধ করতে হয়। তবে, হংকং থেকে বরাদ্দ ফ্রিকুয়েন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচারের কোন বৈধ অনুমোদন নেই বলে গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন জানান।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সম্প্রচারের জন্য ক্যাবল ব্যবসায়ীদের নিকট রিসিভার জয়যাত্রা টিভি বা তার প্রতিনিধির দ্বারা ক্যাবল ব্যবসায়ীদের নিকট সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

প্রতিনিধিরা ক্যাবল ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সম্প্রচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে চাকুরিচ্যুত হয়ে থাকেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এই টিভি বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি জেলায় সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। টিভি চ্যানেলটি রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় করার লক্ষে ব্যাপক উদ্দেশ্য প্রণোদিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়। যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে অধিকসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করা যায়।

র‌্যাব আরও জানান, গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা প্রতিনিধি ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা, উপজেলা প্রতিনিধি দশ থেকে বিশ হাজার টাকা এককালীন প্রদান করতে হয়। এছাড়া প্রতিনিধিদের নিকট হতে প্রতি মাসে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। জয়যাত্রা টিভিটি বিশ্বের প্রায় ৩৪টি দেশে সম্প্রচারিত হয়।

যেখানে দেশের গুরুত্ব বিবেচনায় ১ থেকে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রতিনিধিরা নিয়োগ পেয়ে থাকেন। যারা প্রতি মাসে বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান করে থাকেন। নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ সংগ্রহ ও যাবতীয় হিসাবপত্র গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন এর উপর ন্যাস্ত বলে তিনি জানান।

গ্রেফতারকৃত হাজেরা খাতুন র‌্যাবের নিকট স্বীকার করে বলেন, অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিরা নিয়োগ পেয়েছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীরের পরিকল্পনা, উৎসাহে বা চাপে, নির্দেশনায় জয়যাত্রা টিভির কোন কোন প্রতিনিধি নেতিবাচক কর্মকান্ডে জড়িত হয়েছেন। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তি প্রচার, প্রার্থিতা প্রচার, সাক্ষাতকার ইত্যাদির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ গ্রেফতারকৃতদের মাধ্যমে হেলেনা জাহাঙ্গীর গ্রহণ করে থাকতেন বলে গ্রেফতারকৃতরা জানান।

তিনি আরও বলেন, যে সমস্ত বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে প্রচারিত হত না সেগুলো জয়যাত্রা টিভিতে প্রচার করা হতো। যেমন-তাবিজ- কোবজ, টুটকা- ফাটকা, ভাগ্য বলে দিতে পারে, জ্বীনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, ফারা কেটে যাওয়া এবং গোপন সমস্যার সমাধান ইত্যাদি।