নজর বিডি

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভিসি- ডিএসইউ, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভিসি- ডিএসইউ, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘ছোট বেনজীর’ :রাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে

বিদেশে পালিয়ে থাকা অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের পক্ষে একটি বড় আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই একটি 'বেনজীর' গ্রেপ্তারের আলোড়নে রাষ্ট্র পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে সতর্ক করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অপরাধবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, দৃশ্যমান অপরাধের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’ অপসারিত হলেও তার তৈরি করা গভীর প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং অপরাধের দোসর ‘ছোট বেনজীররা’ এখন ভিন্ন অবয়বে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ফ্যাসিবাদের এই ডালপালা বা অনুপ্রবেশের থাবা এখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এক চরম সংকট তৈরি করেছে।অপরাধবিজ্ঞানের আলোয় ‘ইনসাইডার থ্রেট’অপরাধবিজ্ঞানের সুপরিচিত ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড সিন্ডিকেশন’ (Organized Crime Syndication) তত্ত্ব উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অনুগত ও সুবিধাভোগী অংশ সুযোগ পেলেই নতুন শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে ঢুকে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো রাষ্ট্রের প্রধান স্নায়ুকেন্দ্রে (Nerve Center) এই ধরনের ‘ক্রিমিনাল ইনফিলট্রেশন’ বা অপরাধমূলক অনুপ্রবেশ মূলত তিনটি বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে:১. তথ্য পাচার ও গোয়েন্দা ঝুঁকি (Information Leakage & Espionage): রাষ্ট্রের অতি-গোপনীয় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য প্রতিবিপ্লবী শক্তির কাছে পাচার হওয়া।২. নীতিগত অন্তর্ঘাত (Policy Sabotage): সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতিনির্ধারণে ভেতর থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং জনমনে ক্ষোভ উসকে দেওয়া।৩. শারীরিক ও কৌশলগত অরক্ষিততা (Physical & Tactical Vulnerability): সুযোগ বুঝে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়কে দুর্বল করে ফেলা, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ‘ইনসাইডার অ্যাটাক’ বা প্রশাসনিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।নীতিভ্রষ্ট নেতাদের আশ্রয় ও তৃণমূলের ক্ষোভঅনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি বিশেষ সুবিধাবাদী চক্রের সহায়তায় ফ্যাসিবাদের গর্ভে লালিত আমলারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রে আসীন হতে শুরু করেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নামধারী কিছু অতি-উৎসাহী বা নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তি নিজেদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত আখের গোছাতে এদেরকে হাতে ধরে রাষ্ট্রের শীর্ষ দফতরগুলোতে বসাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।এই সুবিধাবাদী দালাল চক্রের কারণে খোদ তৃণমূল বিএনপিতে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের আগুন জ্বলছে। যে তৃণমূল কর্মীরা দীর্ঘ ১৫ বছর রাজপথে ফ্যাসিবাদী সরকারের অবর্ণনীয় জুলুম, মিথ্যা মামলা এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন, তারা যখন দেখেন যে তাদেরই দলের কিছু নেতার প্রশ্রয়ে ফ্যাসিবাদের দোসররা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুনর্বাসিত হচ্ছে, তখন তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ চরম উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়। তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকা তৃণমূলের এই ক্ষোভ যেকোনো সময় দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের অবমাননাজুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, যারা হাসপাতালে পঙ্গুত্ব বরণ করে এখনো কাতরাচ্ছেন, তাদের প্রতি চরম নৈতিক অন্যায়ের বিষয়টি সামনে এনেছেন বিশ্লেষকরা। যখন এই হতভাগ্য পরিবারগুলো ও চিকিৎসাধীন বিপ্লবীরা দেখেন যে, ফ্যাসিবাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া ‘ছোট ফ্যাসিস্টরা’ আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে ক্ষমতার রস আস্বাদন করছে, তখন তাদের মনোবেদনার গভীরতা মাপা অসম্ভব। অপরাধী চক্রের একজন শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তারের সাময়িক আনন্দধারা দিয়ে এই বঞ্চিত, রক্তাক্ত ভাই-বোনদের ভেতরের কষ্ট ও ক্ষোভ কখনো মুছে ফেলা যাবে না।সময়ের দাবি: আমূল উপাটনরাজনৈতিক ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিবাদের পতন মানে কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং ফ্যাসিবাদী মানসিকতা, আমলাতান্ত্রিক অপরাধী সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল উপাটন।রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল জায়গা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে এই সব বিষাক্ত উপাদান, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ অনুপ্রবেশকারী ও ‘ইনসাইডার থ্রেট’ থেকে অবিলম্বে মুক্ত করার জোর দাবি উঠেছে। দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব ও তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীদের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে এই ‘ছোট বেনজীরদের’ অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে এখনই ঝেঁটিয়ে বিদায় করা সময়ের দাবি। অন্যথায়, যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে, সেই ঐতিহাসিক অর্জন এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর জীবন—দুই-ই এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পতিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘ছোট বেনজীর’ :রাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে