নজর বিডি

আইন-শৃঙ্খলার সুরক্ষা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সার্বভৌমত্বের সংকট

প্রফেসর ড. আসিফ মিজানউপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষকএকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুশাসন (Governance) ও আইনের শাসন (Rule of Law) প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, কার্যকারিতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর সংঘটিত সহিংস হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আইন-শৃঙ্খলার ঘটনা নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, জননিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় সংঘটিত হামলার ঘটনাটি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি মামলার আসামিকে আটক করার পর তার হেফাজতে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে থানায় হামলা, ভাঙচুর, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। এসব তথ্যের পূর্ণ সত্যতা ও দায় নির্ধারণ অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।অপরাধবিজ্ঞানের আলোচনায় গুজব (Rumour), বিভ্রান্তিমূলক তথ্য (Misinformation) এবং জনউত্তেজনা প্রায়ই সহিংসতার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কোনো ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের আগেই আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া কিংবা সংগঠিত সহিংসতা সমাজে আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং অপরাধপ্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে।আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে, জনগণের অভিযোগ থাকলে তারও আইনসম্মত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। এই দুই নীতিই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ খান সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়া যায়। অনেকের মতে, তিনি দায়িত্ব পালনে আন্তরিক, জনবান্ধব ও পেশাদার মনোভাবের পরিচয় দিয়ে আসছেন। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা কিংবা কোনো অভিযোগ—উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রমাণ, তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন।অপরাধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও কর্তৃত্বের ওপরও আঘাত। থানা, আদালত কিংবা অন্য কোনো সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং সরকারি সম্পদ বিনষ্টের মতো কর্মকাণ্ড কখনোই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। যদি এসব অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।একই সঙ্গে সমাজের সচেতন নাগরিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখা, গুজব প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো। সামাজিক দায়িত্বশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।নিরাপদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা—দুইটিই পরস্পর পরিপূরক। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তেমনি জনগণের অধিকার রক্ষায় পুলিশের জবাবদিহিতাও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হয়। এই ভারসাম্যই সুশাসনের প্রকৃত ভিত্তি।পরিশেষে, আগৈলঝাড়া থানার ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে গুজব মোকাবিলা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান ভিত্তি।

আইন-শৃঙ্খলার সুরক্ষা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সার্বভৌমত্বের সংকট