ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসুলবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ (রহ.) হিজরি সপ্তম শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন বিখ্যাত সংস্কারক ইমাম ইবনে তায়মিয়ার প্রধান ও প্রিয়তম ছাত্র। শিক্ষকের স্বাধীন ও সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনার পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে তিনি সমকালীন আলেম ও শাসকদের রোষানলে পড়েন এবং কারাবরণ করেন।ইবনে কাইয়িম তার শিক্ষক ইবনে তায়মিয়ার জীবনের শেষ ১৭ বছর ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। শিক্ষকের সমকালীন প্রথা-বিরোধী ও স্বাধীন ফতোয়াকে সমর্থন করার অপরাধে দামেস্ক দুর্গে শিক্ষকের সাথে তাঁকেও বন্দি করা হয়। সেখানে তিনি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে ইবনে তায়মিয়ার মৃত্যুর পর কারাগার থেকে মুক্তি পান।হাম্বলী মাজহাবে বড় হলেও পরবর্তীতে তিনি কোরআন ও সুন্নাহর প্রত্যক্ষ প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। সমকালীন প্রথাগত ফতোয়ার বাইরে গিয়ে দেওয়া তার কিছু স্বাধীন মতামতের কারণে তিনি আবারও কারাদণ্ডের মুখোমুখি হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, একই মজলিসে এক শব্দে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হওয়া। কোনো মধ্যস্থতাকারী (মুহাল্লিল) ছাড়াই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার বৈধতা দেওয়া।১২৯২ খ্রিস্টাব্দের (৬৯১ হিজরি) সফর মাসে দামেস্কের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম। মূল নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবু বকর। তার বাবা বিখ্যাত ‘জাওজিয়াহ’ মাদ্রাসার প্রধান বা ‘কাইয়িম’ (তত্ত্বাবধায়ক) ছিলেন বলেই তাকে ‘ইবনে কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ’ বলা হয়।বাবা আবু বকর বিন আইয়ুব, সাফিউদ্দিন আল-হিন্দি, হাফেজ আল-মিজ্জি, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ হাফেজ আজ-জাহাবি এবং প্রধান শিক্ষক ইমাম ইবনে তায়মিয়া।বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসির ও ইতিহাসবিদ হাফেজ ইবনে কাসির (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-এর লেখক), ইবনে রজব আল-হাম্বলি এবং অভিধান প্রণেতা মাজদুদ্দিন আল-ফিরোজাবাদি।তার রচিত ‘জাদুল মাআদ’, ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন’, ‘মাদারিজুস সালিকিন’, ‘আদ-দা ওয়া আদ-দাওয়া’ এবং ‘কিতাবুর রূহ’ আজও মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত। এছাড়া তৎকালীন বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর জবাবে তার লেখা ৬ হাজার লাইনের বিখ্যাত ‘নূনিয়া’ কবিতা অন্যতম এক কালজয়ী সৃষ্টি।মৃত্যু, ১৩ খ্রিস্টাব্দের (৭৫১ হিজরি) সেপ্টেম্বর মাসে ৬০ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। উমাইয়া মসজিদে জানাজা শেষে দামেস্কের ‘বাবুস সাগির’ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।