নজর বিডি

গণতন্ত্রের নতুন অরুণোদয়: নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বে রাষ্ট্র ও সরকারের মেলবন্ধন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ২১ আগস্ট ২০২৬ একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সময়ে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে রাষ্ট্রের শীর্ষ দুই সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।এ ঘটনাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের অনেকটাই অনালোচিত থেকে যাবে। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচিত নেতৃত্বের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়নের একটি সুযোগ তৈরি করেছে।রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও গণতান্ত্রিক বৈধতারাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ‘Political Institutionalization’ বা রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, স্থায়িত্ব ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক বৈধতা শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হওয়া গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।অতীতে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অরাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের শীর্ষ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ায় ‘Democratic Legitimacy’ বা গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং ‘Popular Sovereignty’ বা জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।তবে শুধু নির্বাচিত রাজনৈতিক পরিচয়ই যথেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে—তার ওপর।রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সমন্বয়বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার ক্ষেত্র পৃথক। ফলে দুই শীর্ষ পদে রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তির উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে না। বরং সাংবিধানিক বিধান, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করবে এই সম্পর্কের কার্যকারিতা।রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী নেতৃত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট সমন্বয় থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষমতার প্রয়োগে সাংবিধানিক সীমারেখা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা জরুরি।অতএব, এই নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সুশাসনের প্রত্যাশাবাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর সামনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কার‘Good Governance’ বা সুশাসনের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ, আইনের শাসন ও কার্যকর প্রশাসন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামোর দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।অর্থনৈতিক কূটনীতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাবর্তমান বিশ্বে একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ওপর।দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল শ্রমশক্তি, রপ্তানি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। এসব সুবিধাকে কাজে লাগাতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক, বৈদেশিক বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।অর্থনৈতিক কূটনীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।আইনের শাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়নরাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচারে সমান সুযোগ এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি।একই সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণা এবং মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হলে তরুণ জনগোষ্ঠী সম্পদ না হয়ে রাষ্ট্রের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। তাই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা প্রয়োজন।গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ওপর২১ আগস্ট ২০২৬-এর রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ দুই পদে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।তবে কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে না। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, মুক্ত গণমাধ্যম, সক্রিয় নাগরিক সমাজ এবং অবাধ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাংবিধানিক ভূমিকার সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে কার্যকর করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা।বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এই নতুন অধ্যায় শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তার উত্তর নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার সমন্বয়ে। নির্বাচিত নেতৃত্ব যদি জনগণের ম্যান্ডেটকে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তবেই আজকের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ও ইতিবাচক অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজানউপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।

গণতন্ত্রের নতুন অরুণোদয়: নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বে রাষ্ট্র ও সরকারের মেলবন্ধন