নজর বিডি

গুলির সেই দিন, যা ভুলতে পারেননি সাংবাদিকরা

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গাইবান্ধায় কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়া সাংবাদিকরা এক বছর পরও সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি, টিয়ারশেল ও কাঁদানে গ্যাসে আহত হয়ে মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি হওয়া সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। তৎকালীন বার্তাবাজার অনলাইনের গাইবান্ধা প্রতিনিধি সুমন মিয়া বলেন, সেদিন শহরের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘিরে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অবস্থান নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে ছররা গুলি, টিয়ারশেল ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। তিনি বলেন, সংঘর্ষের সময় পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে তিনি, ঢাকা পোস্টের তৎকালীন গাইবান্ধা প্রতিনিধি রিপন আকন্দ এবং ঢাকা টাইমসের প্রতিনিধি জাভেদ হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। সুমনের শরীরে পাঁচটি ছররা গুলি লাগে। ঘটনার ভয়াবহতা স্মরণ করে সুমন বলেন, “গুলির আঘাতে আমার পা দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়ছিল। সামনে দেখি সহকর্মী রিপন আকন্দ কাটা মুরগির মতো ছটফট করছেন, তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সেই দৃশ্য দেখে আমিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।” রিপন আকন্দ জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আত্মরক্ষার জন্য তারা এসপি অফিসের সামনে একটি ফাঁকা স্থানে আশ্রয় নেন। কিন্তু কাঁদানে গ্যাসের তীব্র প্রভাবে সেখানে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। পরে দেয়াল টপকে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্থানীয়রা তাদের পানি দিয়ে প্রাথমিক সহায়তা করেন। পরে সহকর্মী জাভেদ হোসেনের সহযোগিতায় তারা চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যান। তবে আহতদের অতিরিক্ত ভিড় থাকায় পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। অন্যদিকে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ১৫টি ছররা গুলিতে আহত হওয়া ঢাকা টাইমসের গাইবান্ধা প্রতিনিধি ও গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাভেদ হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট তিনি ছিলেন সেই রক্তাক্ত দিনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি জানান, সংঘর্ষ চলাকালে কয়েকজন সাংবাদিক পুলিশের উদ্দেশে গুলি বন্ধ করার আহ্বান জানালেও তা উপেক্ষা করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া গুলিতে তারাসহ আরও সাংবাদিক আহত হন। জাভেদ লেখেন, দীর্ঘ সময় চিকিৎসা, একাধিক অস্ত্রোপচার, শরীর থেকে গুলির স্প্লিন্টার অপসারণ এবং পুনর্বাসনের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে। এখনও শরীরে সেই গুলির ক্ষত বহন করছেন তিনি। সেদিন আহতদের চিকিৎসা দেওয়া গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তৎকালীন চিকিৎসক ডা. তানভির রহমান কল্লোল বলেন, সংঘর্ষের পর মুহূর্তের মধ্যে শত শত আহত ব্যক্তি হাসপাতালে আসতে থাকেন। অধিকাংশই ছিলেন গুলিবিদ্ধ। পরিস্থিতি সামাল দিতে আনুষ্ঠানিক ভর্তি প্রক্রিয়া বাদ দিয়েই জরুরি চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছিল। ঘটনার কয়েক মাস পর, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর গাইবান্ধার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন আহত ওয়াহেদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গাইবান্ধার তৎকালীন পুলিশ সুপার কামাল হোসেন এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ ৭০ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি জানিয়েছে, তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, ওই সময়কার ঘটনাসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

গুলির সেই দিন, যা ভুলতে পারেননি সাংবাদিকরা