নজর বিডি

চট্টগ্রামে গ্যাস ও বিদ্যুতের হাহাকার, ধুঁকছে শিল্প খাত

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন জ্বলছে না চুলা, শিল্প-কারখানায় নেমে এসেছে স্থবিরতা, আর সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য চলছে হাহাকার। একই সাথে গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় নগরজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের জনজীবন, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এক চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের শুরুতে সরবরাহ ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি থাকলেও, চলতি আগস্টের শুরু থেকে তা আরও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।গ্যাস সংকটের কারণে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া ও পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে আসে। ফলে দুপুরের রান্না করতে হচ্ছে গভীর রাতে, আর অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।নগরীর আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,"এক সপ্তাহ ধরে রান্নার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালেই গ্যাস চলে যায়। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। বড়রা খেলেও ছোট শিশুদের নিয়মিত হোটেলের খাবার খাওয়ানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি।"একই চিত্র সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম জানান,"আগে যেখানে ১০-২০ মিনিটে গ্যাস নেওয়া যেত, এখন ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দিনের বেশির ভাগ সময় লাইনেই কেটে গেলে সংসার চালাব কীভাবে?"শিল্প খাতে বড় ধাক্কা, কমছে উৎপাদনকেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। ইস্পাত, টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাতগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন,"গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ও পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী হওয়ায় এই সংকট জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।"গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলোতেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের এই দ্বিমুখী সংকটে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। উপরন্তু, জাতীয় গ্রিডের সামগ্রিক ঘাটতি মেটাতে চট্টগ্রামের বরাদ্দের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকায় ডাইভার্ট বা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামে স্থানীয় সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন,"জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছি না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ১ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও চাপ কম থাকায় অবস্থা আরও বেগতিক হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।"জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি সচল না হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের এই তীব্র গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামে গ্যাস ও বিদ্যুতের হাহাকার, ধুঁকছে শিল্প খাত