নজর বিডি

জলাবদ্ধতা নিরসনে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও TRM বাস্তবায়নের বিকল্প নেই

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও TRM বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলা এবং যশোরের মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা এখন আর সাময়িক বা মৌসুমি দুর্যোগ নয়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর চেপে বসা এক স্থায়ী সংকট। স্থানীয় জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভবদহ স্লুইসগেট ও সংলগ্ন জলাবদ্ধ এলাকা আজ এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।ভবদহ ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়াসহ ভবদহ অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি বছরের দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী, হরি, ভদ্রা ও শালতা নদীর তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বিল ও নিম্নাঞ্চল থেকে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।জলাবদ্ধতার বহুমাত্রিক প্রভাবদীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। ফসলের জমি, মাছের ঘের ও সবজি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।একই সঙ্গে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।জলাবদ্ধতার কারণে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সংকটে পড়ে। পানির উৎস দূষিত হওয়া এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে এটি কেবল পানি নিষ্কাশনের সমস্যা নয়; বরং কৃষি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বহুমাত্রিক সংকট।পোল্ডার ব্যবস্থার অনভিপ্রেত ফল১৯৬০-এর দশকে জোয়ার-ভাটা ও বন্যার ক্ষতি থেকে মানুষ ও কৃষিজমি রক্ষায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পোল্ডার বা বাঁধঘেরা এলাকা গড়ে তোলা হয়। এই ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে বন্যার ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে এর কিছু অনভিপ্রেত পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হয়।জোয়ারের সঙ্গে আসা পলিযুক্ত পানি আগে প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ত। পোল্ডার নির্মাণের ফলে সেই পলি আর স্বাভাবিকভাবে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ফলে নদীখাতেই পলি জমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে নাব্যতা কমে যায়।এর সঙ্গে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদী দখল, নদীর চরে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও ইটভাটা এবং বিভিন্ন জলাশয়ে অননুমোদিত নেট-পাটা ব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পে কেন স্থায়ী সমাধান হয়নিজলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে নদী খনন, রেগুলেটর নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারেনি।ফলে একদিকে নদী খনন করা হয়েছে, অন্যদিকে আবার নদীতে পলি জমেছে। একই সমস্যা বারবার ফিরে এসেছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে।টিআরএম হতে পারে টেকসই সমাধানএই পরিস্থিতিতে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি একটি বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশসম্মত সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।TRM পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিল বা জলাবদ্ধ এলাকায় জোয়ারের পলিযুক্ত পানি প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে পলি বিলের ভেতরে জমে ভূমির উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ে। একই সঙ্গে নদীখাতে পলি জমার চাপ কমে এবং নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।বিল ভায়না ও সাতক্ষীরার পাখিমারা বিলে TRM-এর অভিজ্ঞতা এ পদ্ধতির সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তবে TRM বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় মানুষের আস্থা।আস্থার সংকট দূর করা জরুরিTRM বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের যথাসময়ে ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ না দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ না থাকা এবং বৈজ্ঞানিক মডেলিং অনুযায়ী সমন্বিতভাবে কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে।ফলে কোনো এলাকায় TRM নিয়ে সুফলের অভিজ্ঞতা থাকলেও অন্য এলাকায় তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।তাই TRM বাস্তবায়নের আগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ভূমিমালিকদের সঙ্গে আলোচনা, ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতাদীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)-কে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবদহ ও সংলগ্ন পাঁচটি নদীর প্রায় ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের কাজ চলছে, যেখানে সেনাবাহিনী তদারকির দায়িত্ব পালন করছে।তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি TRM বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।তাৎক্ষণিক করণীয়দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—চলমান ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের কাজ দ্রুত শেষ করা;তীব্র প্লাবিত বিলগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা;খাল-নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা;অননুমোদিত মাছের ঘের, নেট-পাটা ও পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন স্থাপনা অপসারণ করা।মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাIWM-এর সমীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক মডেলিংয়ের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে উপযুক্ত বিলে TRM চালু করা যেতে পারে।এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত, স্বচ্ছ ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি, কৃষক প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিদের প্রকল্প পরিচালনা ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।দীর্ঘমেয়াদি সমাধানভবদহ-বিল ডাকাতিয়া অববাহিকার জন্য একটি স্থায়ী সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি, পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তন বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয়।একই সঙ্গে রিমোট সেন্সিং, GIS ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত পলি জমার হার, নদীর নাব্যতা, জলপ্রবাহ ও ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।ভবদহ ও সংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা কোনো একদিনের সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিবেশগত পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। তাই কেবল সাময়িক নদী খনন, পাম্প বসানো কিংবা ত্রাণ বিতরণের মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM)-কে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আস্থা।সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা শুধু নিয়ন্ত্রণই নয়, নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে এনে কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।

জলাবদ্ধতা নিরসনে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও TRM বাস্তবায়নের বিকল্প নেই