নজর বিডি

ডুমুরিয়ায় সিন্ডিকেটের জালে পিষ্ট সবজিচাষি

দূর থেকে তাকালে মনে হবে সবুজের বিশাল সমুদ্র। যতদূর চোখ যায়, উচ্ছে, করলা, শসা, মিষ্টি কুমড়া ও চালকুমড়ার পাতায় ঢেকে আছে মাঠের পর মাঠ। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই রয়েছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। মাসের পর মাস শ্রম, অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করে সবজি উৎপাদন করেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ডুমুরিয়ার কৃষকেরা।কৃষকেরা জানান, তিন থেকে চার মাস ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে তারা সবজি চাষ করেন। তীব্র রোদ, ঝড়-বৃষ্টি ও নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ফসল ফলানোর পর তাদের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় বাজারজাতকরণের সময়।অভিযোগ রয়েছে, ডুমুরিয়ার পাইকারি সবজির বাজারের একটি অংশে কতিপয় আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাবের কারণে কৃষকেরা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, সকালে আড়তে সবজি জমা দেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পণ্যের দাম জানানো হয় না। দিনভর সবজি বিক্রি হওয়ার পর রাতে আড়তদাররা নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করেন।কখনো কেজিপ্রতি ৮ টাকা, কখনো ১০ টাকা আবার কখনো ১২ টাকা দরে কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন চাষিরা। এতে ফসলের প্রকৃত উৎপাদন খরচও অনেক সময় উঠে আসে না।কৃষকদের আরও অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে যে সবজি ৮ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, একই সবজি ভোক্তা পর্যায়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদক কৃষক যেমন ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি চড়া দামে সবজি কিনতে গিয়ে ভোক্তারাও বিপাকে পড়ছেন। মাঝখানে লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ী চক্র।ডুমুরিয়ার কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. আব্দুল রাজ্জাক বলেন, পণ্য জমা নেওয়ার পর রাতে দাম নির্ধারণ করা অনৈতিক ও আইনবহির্ভূত। কৃষি বিপণন আইনের আলোকে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আড়তগুলোতে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ও উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে কৃষকের পণ্যের দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।তিনি বলেন, ডুমুরিয়ার আড়তগুলোতে কৃষকদের বঞ্চনা বন্ধে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হবে। কৃষক যেন তার পণ্যের মূল্য সম্পর্কে আগে জানতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ডুমুরিয়ার কৃষকেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।তিনি বলেন, উৎপাদনের পর বাজারজাতকরণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের আগ্রহ কমে যায়। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি বিপণন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি ‘কৃষক বাজার’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন।ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সবিতা সরকার বলেন, কৃষকের উৎপাদিত ফসলের মূল্য আড়তদাররা ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করবেন—এমন ব্যবস্থা চলতে দেওয়া হবে না। কৃষকের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি জানান, এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাজারগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কৃষকদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, বাজারে কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদনের পর যদি ন্যায্য দাম না মেলে, তাহলে ভবিষ্যতে সবজি চাষে আগ্রহ হারাবেন অনেকেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষক পরিবার, পাশাপাশি প্রভাব পড়বে দেশের সবজি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায়। তাই কৃষকের ঘামের মর্যাদা দিতে দ্রুত বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ডুমুরিয়ায় সিন্ডিকেটের জালে পিষ্ট সবজিচাষি