দিনাজপুরের মধ্য খানসামা উপজেলার সুবর্ণখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জেবুন নেছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করছেন অভিভাবকদের অনেকে। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষিকাকে অন্যত্র বদলির দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক।বিদ্যালয়টির সামনে রয়েছে বড় খেলার মাঠ। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। তবে কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিটি শ্রেণিতে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী ছিল, বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে হাতেগোনা কয়েকজনে।অভিভাবকদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই জেবুন নেছার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে নিয়মিত সময়ে বিদ্যালয়ে না আসা, দ্রুত বিদ্যালয় ত্যাগ করা, অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করার অভিযোগও করেন তারা।অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকার অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করায় শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করেন।সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য দিনের মতোই পাঠদান কার্যক্রম চলছে। তৃতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ৭ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৮ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। তাদের পাঠদানে প্রধান শিক্ষিকাসহ চারজন শিক্ষক ও একজন দপ্তরি দায়িত্ব পালন করছেন।বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকা নিয়মিত ক্লাস নেন না। অনেক সময় বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণে পাঠদানে পর্যাপ্ত সময় দেন না বলেও তারা অভিযোগ করে।অভিভাবক মুক্তা বানু বলেন, ‘বিদ্যালয়ে আমার সন্তান পড়ে। কোনো বিষয় নিয়ে প্রধান শিক্ষিকার কাছে গেলে তিনি খারাপ ব্যবহার করেন। এমনকি অভিভাবকদের হুমকিও দেন। এভাবে তো আমার সন্তানকে ওই স্কুলে পড়াব না।’অভিভাবক বানু আক্তা বলেন, ‘একটি সরকারি স্কুলে সাধারণত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকে। কিন্তু এই স্কুলে হাতে গোনা কয়েকটি শিশু পড়াশোনা করছে। তিনি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। আমরা এ ধরনের শিক্ষিকাকে এই স্কুলে চাই না। কয়েকবার প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানিয়েছি। তারা তদন্তও করেছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাখাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘যোগদানের পর থেকেই তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে আন্তরিক হতে চান না। নিজ খেয়ালখুশিমতো চলাফেরা করেন এবং আমাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন। বিভিন্ন নেতাকে দিয়ে ফোন করিয়ে হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিদ্যালয়ে ঠিকমতো আসেন না। এলেও দেরিতে আসেন এবং দ্রুত চলে যান।’তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়ে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ আসে। কিন্তু তিনি তা যথাযথভাবে ব্যয় করতে চান না বলে আমাদের অভিযোগ। কয়েক দিন আগে অর্থ বরাদ্দ হলেও তা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজেও তার অনীহা রয়েছে। বিদ্যালয়ের অর্থের হিসাব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া তিনি এসএমসি কমিটি গঠন করতে দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।’অপর সহকারী শিক্ষক ইসলাম আলী বলেন, ‘গত বছরের জুন থেকে তিনি সহকারী শিক্ষকদের হয়রানি শুরু করেছেন। এমনকি বিদ্যালয়ে পুলিশও নিয়ে এসেছেন। অভিভাবকদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেন। তার কারণে বিদ্যালয়টি একেবারে খারাপ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এসব ঝামেলা দেখে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। আমরা বিতর্কিত এই প্রধান শিক্ষিকাকে অন্যত্র বদলির দাবি জানাচ্ছি।’তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা জেবুন নেছার বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ এম শাহজাহান সিদ্দিক বলেন, ‘ইতিপূর্বে ওই এলাকার স্থানীয়রা লিখিত অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। আমরা খুব শিগগিরই পুরো উপজেলায় একযোগে পরিদর্শন করব। প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ এবং প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কতটা সত্য, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।