ট্রেজারি বিল-বন্ড ও ফি আয়ে ভর করে ব্যাংক খাতের মুনাফায় বড় লাভ, তবে ইসলামী ব্যাংকে রেকর্ড লোকসান।চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধীর থাকায় উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ এবং ফি-কমিশনভিত্তিক আয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই মুনাফায় এই সাফল্য এসেছে। তবে খেলাপি ঋণ ও উচ্চ প্রভিশনের চাপ সামলাতে না পেরে বেশ কিছু ব্যাংক বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে।শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ৩১টি ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—১৭টি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে, ৭টির কমেছে, ৬টির লোকসান বেড়েছে এবং ১টি ব্যাংক মুনাফা থেকে নতুন করে লোকসানে চলে গেছে। বাকি ৫টি ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ায় থাকায় তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধ রয়েছে।শীর্ষ মুনাফাকারী ও প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকা ব্যাংকসমূহ: চলতি বছরের প্রথমার্ধে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক (প্রবৃদ্ধি ৫৭%)। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার কমে ২.০৩%-এ নেমে এসেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক (প্রবৃদ্ধি ১৯%)। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক ৫৭% প্রবৃদ্ধিতে ৫২৭ কোটি টাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সর্বোচ্চ ৩২১% নিট মুনাফা বৃদ্ধিতে ৪৪২ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। ইস্টার্ন ব্যাংক (৪৩৯ কোটি) ও প্রাইম ব্যাংকও (৪৩৩ কোটি) ভালো পারফর্ম করেছে।অন্যদিকে ব্যাংক এশিয়া, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংকসহ ৭টি ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। পাশাপাশি আইএফআইসি, ন্যাশনাল, রূপালী, এবি, প্রিমিয়ার ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।ইসলামী ব্যাংকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা: আলোচিত সময়ে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। গত বছরের প্রথমার্ধে ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করলেও চলতি বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা সমন্বিত লোকসান গুনেছে। আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ থেকে আয় হ্রাস, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ব্যাংকে প্লেসমেন্ট থেকে আয় কমে যাওয়াকে এই লোকসানের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনা: ব্যাংকিং খাতের এই প্রবণতা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, "যেসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম-নীতি (যেমন সিআরআর, এসএলআর ও এডিআর) মেনে চলেছে, তারাই ভালো পারফর্ম করছে। আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করে সুশাসন বজায় রাখাই ব্যাংকগুলোর মূল চাবিকাঠি।"তবে এ ধরণের মুনাফা অর্জনের টেকসই মডেল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, "জনসাধারণের আমানত বেসরকারি খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে সরকারি বিল-বন্ডে নিয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য নিরাপদ ব্যবসায়িক কৌশল হতে পারে, কিন্তু এটি ব্যাংকিং লাইসেন্সের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য শুভকর নয়।"