নজর বিডি

রাজনৈতিক অর্থনীতি: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বনাম রাজনৈতিক দৃঢ়তা

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন ও কাঠামোগত রূপান্তর অনেকাংশে নির্ভর করে তার নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ার গতিশীলতা এবং সেই নীতি বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদি কাঠামোয় আমলাতন্ত্র (Bureaucracy) এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব (Political Authority)—রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করে, আর আমলাতন্ত্র সেই নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতায় এই দুই শক্তির সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা, নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তাই আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।এই সম্পর্ক বিশ্লেষণে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব’ (Principal-Agent Theory)—সহায়ক হতে পারে। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো ‘প্রিন্সিপাল’ যখন তার পক্ষে কোনো কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব ‘এজেন্ট’-এর ওপর ন্যস্ত করেন, তখন তথ্যের অসমতা ও স্বার্থের পার্থক্য থেকে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এজেন্ট কখনো কখনো প্রিন্সিপালের স্বার্থের পরিবর্তে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।ম্যাক্স ওয়েবারের (Max Weber) আদর্শ আমলাতান্ত্রিক মডেলে আমলাদের হওয়ার কথা পেশাদার, নিরপেক্ষ, নৈর্ব্যক্তিক এবং নিয়মতান্ত্রিক। রাষ্ট্রের নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক উত্তরাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হামজা আলাভীর ‘ওভার-ডেভেলপড স্টেট’ (Over-developed State) ধারণাটি আলোচনায় আসে। তার বিশ্লেষণে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক কাঠামো অনেক সময় সমাজ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অতিরিক্ত শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্বের আলোকে সমস্যাটিকে দেখলে ‘এজেন্ট মোরাল হ্যাজার্ড’ (Agent Moral Hazard) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। যখন এজেন্টের কাছে বেশি তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকে, কিন্তু তার ওপর কার্যকর নজরদারি দুর্বল হয়, তখন সে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে এমন প্রবণতা তৈরি হলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’ (Regulatory Capture)। জোসেফ স্টিগলিটজসহ অর্থনীতিবিদেরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখিয়েছেন, কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যদি নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতেও প্রশাসন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।রাজনৈতিক দৃঢ়তা কেন প্রয়োজনএর বিপরীতে প্রয়োজন বলিষ্ঠ, নীতিনিষ্ঠ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। রাজনৈতিক দৃঢ়তা (Political Assertiveness) বলতে এখানে ক্ষমতার প্রদর্শন বোঝানো হচ্ছে না; বরং জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনের ওপর কার্যকর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতাকে বোঝানো হচ্ছে।প্রিন্সিপাল-এজেন্ট কাঠামোতে প্রিন্সিপালের অন্যতম দায়িত্ব হলো এজেন্টের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ হচ্ছে ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস এবং নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের প্রতিনিধি। ফলে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা হওয়া উচিত নির্বাচিত সরকারের নীতি বাস্তবায়ন এবং পেশাগত পরামর্শ প্রদান করা।ডেভিড ইস্টনের (David Easton) ‘সিস্টেমস অ্যানালাইসিস’ (Systems Analysis) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, জনগণের দাবি ও প্রত্যাশা রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাছে ‘ইনপুট’ হিসেবে প্রবেশ করে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও নীতির মাধ্যমে ‘আউটপুট’ হিসেবে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের চাহিদার প্রতিফলন যদি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।রাজনীতি যখন নিজস্ব নীতি, আদর্শ ও গণমুখী চরিত্র হারিয়ে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর পাশাপাশি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বা ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ (Crony Capitalism) শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ সীমিত কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।ডগলাস নর্থের (Douglass North) ‘লিমিটেড অ্যাকসেস অর্ডার’ (Limited Access Order) ধারণার আলোকে বলা যায়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ যদি একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশের জন্য করণীয়বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় প্রত্যাশা হলো স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহ্রাসকারী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সম্পর্কের তথ্যের অসমতা কমানো এবং কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।১. রাজনৈতিক ও সংসদীয় তদারকি জোরদারনীতি নির্ধারণে নির্বাচিত সরকার ও সংসদীয় কমিটির কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। আমলারা নীতি প্রণয়নে প্রয়োজনীয় পেশাগত পরামর্শ দেবেন এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন—কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা যেন নির্বাচিত রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে প্রতিস্থাপন না করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।২. পেশাদারিত্ব ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রশাসননিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট (New Public Management) ধারার আলোকে সরকারি সেবায় দক্ষতা, ফলাফল ও নাগরিক সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাগত যোগ্যতা প্রশাসনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।৩. তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাতথ্য অধিকার আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের তথ্য যত বেশি নাগরিকের কাছে উন্মুক্ত হবে, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।৪. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণস্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, সক্ষম ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা বাড়ানো গেলে কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকেও স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার আওতায় রাখতে হবে।ভারসাম্যই মূল কথাবাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।এখানে আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করা কোনো সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন দক্ষ, নিরপেক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র। একই সঙ্গে প্রয়োজন নীতিনিষ্ঠ, গণমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক নেতৃত্ব।অধ্যাপক রওনক জাহানের রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কিত বিশ্লেষণ এবং অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক নীতি কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া আমাদের এ আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের পেশাগত দক্ষতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নীতি নির্ধারণী কর্তৃত্বও গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র হবে দক্ষ ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নকারী; আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক নীতি নির্ধারক।তাই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ‘আমলাতন্ত্র বনাম রাজনীতি’ নয়, বরং ‘দক্ষ আমলাতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়’। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই সুশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারে।লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজানউপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া)রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক

রাজনৈতিক অর্থনীতি: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বনাম রাজনৈতিক দৃঢ়তা