রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: একটি নির্মোহ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং আইনসভার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন কি শূন্য হবে?বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও এর উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ বা দলীয় অবস্থানের পরিবর্তে সংবিধানের ভাষা, কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আইনের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।সাংবিধানিক কাঠামো: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ৭০ অনুচ্ছেদবাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।অন্যদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।এই দুটি সাংবিধানিক বিধানকে পাশাপাশি রাখলেই মূল বিতর্কটি স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা ভোট দেন—কিন্তু তাঁরা কি তখন সংসদীয় আইনপ্রণয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ভোট দেন, নাকি একটি বিশেষ সাংবিধানিক নির্বাচনের নির্বাচক হিসেবে ভোট দেন?চিফ হুইপের অবস্থানের যুক্তিরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য—এমন অবস্থানের প্রধান ভিত্তি হলো সংবিধানের সরল ভাষা।৭০ অনুচ্ছেদে ‘সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান’-এর কথা বলা হয়েছে। এখানে আইন, বিল, বাজেট, অনাস্থা প্রস্তাব বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সংসদীয় বিষয়ের মধ্যে দলবিরোধী ভোটকে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। ফলে একটি সাংবিধানিক নির্বাচনের ভোট যদি সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদ ভবনে প্রদান করা হয়, তাহলে সেটিকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতার বাইরে রাখার যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য—সেটিই মূল প্রশ্ন।এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও সংসদ সদস্যদের একটি সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। দলীয়ভাবে মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়া হলে সেটিকে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে বিবেচনা করার সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে।বিপরীত মতের আইনি যুক্তিতবে এর বিপরীতে শক্তিশালী কিছু আইনি প্রশ্নও রয়েছে।প্রথমত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো আইন, বাজেট বা সংসদীয় প্রস্তাবের ওপর ভোট নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন। সংসদ সদস্যরা এখানে আইনপ্রণেতা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে ভোট প্রদান করেন—এমন ব্যাখ্যারও যথেষ্ট তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে।দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাধারণ সংসদীয় কার্যক্রমের মতো স্পিকারের সভাপতিত্বে কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর ভোট গ্রহণ এখানে হয় না। ফলে ‘সংসদে ভোটদান’ কথাটির অর্থ কেবল সংসদ কক্ষের ভেতরে যেকোনো ভোটদান—নাকি সংসদের আইনপ্রণয়নমূলক কার্যক্রমে ভোটদান—তা ব্যাখ্যার বিষয়।তৃতীয়ত, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট ব্যবস্থার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংসদ সদস্য কাকে ভোট দিয়েছেন তা যদি আইনত গোপন থাকে, তাহলে শুধু ভোটের ফলাফল দেখে নির্দিষ্ট কোনো সদস্য দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন—এটি কীভাবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন।গোপন ব্যালট কি ৭০ অনুচ্ছেদকে অকার্যকর করে?এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে।গোপন ব্যালটের অর্থ এই নয় যে সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অধিকার সাংবিধানিকভাবে পেয়ে গেলেন। আবার এটিও বলা যায় না যে গোপন ভোটের মাধ্যমে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার ঘটনা ঘটলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রমাণিত হয়ে যাবে।অর্থাৎ, এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে—দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ কি না এবং কোনো নির্দিষ্ট সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন—তা আইনগতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব কি না।প্রথম প্রশ্নের উত্তর এবং দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর একই হওয়া জরুরি নয়।দলীয় ম্যান্ডেট বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতাসংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ সংসদ সদস্য দলীয় প্রতীক ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে দলীয় অবস্থান ও দলীয় শৃঙ্খলার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।তবে সংসদ সদস্য একই সঙ্গে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। ফলে দলীয় আনুগত্য এবং প্রতিনিধির সাংবিধানিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।বাংলাদেশের ৭০ অনুচ্ছেদ এই ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এর ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা অন্য অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রের তুলনায় বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সীমিত।কিন্তু সেই কঠোরতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি বিশেষ সাংবিধানিক নির্বাচনে কতটা বিস্তৃত হবে—তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়, সংবিধানের পাঠ ও বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে নির্ধারণ করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।‘ফ্লোর ক্রসিং’ শব্দটির প্রয়োগ কতটা যথাযথ?রাজনৈতিক ভাষায় দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াকে ‘ফ্লোর ক্রসিং’ বলা হলেও আইনগত বিশ্লেষণে শব্দটির পরিবর্তে সংবিধানের সুনির্দিষ্ট ভাষাই প্রাধান্য পাবে।৭০ অনুচ্ছেদের মূল বিষয় হলো—সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করেছেন কি না এবং সংসদে তিনি দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন কি না। অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানের ঘটনাকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আনতে হলে প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে, ওই ভোটটি সাংবিধানিক অর্থে ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান’ কি না।এখানেই আইনি ব্যাখ্যার প্রকৃত জায়গা।একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যদলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করা এবং ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যাওয়া—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।কোনো সদস্য দলীয় নির্দেশ অমান্য করলে দল তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার মতো একটি সাংবিধানিক পরিণতি ঘটাতে হলে সংবিধানে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটি অবশ্যই আইনগতভাবে নির্ধারিত হতে হবে।অর্থাৎ, রাজনৈতিক অবাধ্যতা এবং সাংবিধানিক অযোগ্যতা—দুটি পৃথক বিষয়।নির্মোহ মূল্যায়নসমগ্র বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়া ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়বে—এমন ব্যাখ্যার পক্ষে সংবিধানের ভাষাগত ও দলীয় শৃঙ্খলাভিত্তিক শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে। বিশেষ করে ‘সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান’ কথাটিকে বিস্তৃত অর্থে ব্যাখ্যা করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।তবে এটিকে ‘অকাট্য’ বা ‘অনিবার্য’ সাংবিধানিক সত্য হিসেবে ঘোষণা করাও সতর্কতাহীন হবে। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন এবং এর ভোট গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে এখানে ৭০ অনুচ্ছেদের বস্তুগত প্রয়োগের পাশাপাশি প্রমাণের প্রশ্ন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বাতন্ত্র্য এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।সুতরাং, রাজনৈতিকভাবে কোনো দল তার সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে—এটি দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে ৭০ অনুচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন এবং প্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক ব্যাখ্যা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবিধানের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তার নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী একই সাংবিধানিক বিধানের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ দাঁড় করানো যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক অবস্থানকে সাংবিধানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও সমানভাবে পরিহারযোগ্য।রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৭০ অনুচ্ছেদের এই বিতর্ক তাই কেবল একটি নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; এটি দলীয় শৃঙ্খলা, সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকা, গোপন ভোটের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ব্যাখ্যার সীমা—এই চারটি মৌলিক নীতির পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।লেখক:প্রফেসার ড. আসিফ মিজানরাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া)