নজর বিডি

সমন্বিত খামারে যুবক রাহুলের বাজিমাত, বছরে আয় ১৫-২০ লাখ টাকা

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বান্দা গ্রামে সমন্বিত কৃষি ও মৎস্য খামার গড়ে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বিশ্বাস। রঙিন সৌখিন মাছের পোনা উৎপাদন, উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ, বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন এবং পশুপাখি পালন—সব মিলিয়ে তাঁর ‘বিশ্বাস এগ্রো প্রজেক্ট ও মৎস্য হ্যাচারি’ এখন এলাকার অন্যতম আলোচিত কৃষি উদ্যোগ। এসব কার্যক্রম থেকে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করছেন তিনি।ডুমুরিয়া সদর থেকে পিচঢালা সড়ক ধরে প্রায় চার কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়ে ছায়া-সুনিবিড় বান্দা গ্রাম। রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে রাহুলের সমন্বিত কৃষি ও মৎস্য প্রকল্প। খামারে ঢুকতেই দেখা যায় নানা রঙ ও আকৃতির সৌখিন মাছের পোনা উৎপাদনের ব্যস্ততা।হ্যাচারির অফিসের সামনে গিয়ে এক শিক্ষার্থীকে সাদা, কালো, হলুদ ও কমলা রঙের সৌখিন মাছের জোড়া কিনতে দেখা যায়। প্রিয় বন্ধুকে উপহার দেওয়ার জন্য মাছ কিনতে এসেছেন তিনি। রাহুলের হাসিমুখে আতিথেয়তা ও সুলভ মূল্যে মাছ বিক্রির বিষয়টিও নজর কাড়ে।কৃষি কলেজে পড়াশোনার সময় থেকেই কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় রাহুল বিশ্বাসের। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জাতের গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ করে সফলতা পাওয়ার পর অ্যাকুরিয়ামের সৌখিন মাছের ব্যাপক চাহিদা তাঁকে নতুন করে ভাবায়। প্রায় দুই বছর আগে তিনি বাণিজ্যিকভাবে অর্নামেন্টাল ফিশ বা সৌখিন মাছ চাষের উদ্যোগ নেন।গত বছর তিনটি হাউস, আধুনিক পানির পাম্প ও ছয়টি পুকুর নিয়ে গড়ে তোলেন বিশেষায়িত সৌখিন মাছের হ্যাচারি। বর্তমানে সেখানে মলি, মুন্টেল, কমেন্ট, শেখ পোলার, অ্যাঞ্জেল, গাপ্পি, গোল্ডফিশ, কৈ-কার্প, বাটারফ্লাই ও টেট্রাসহ প্রায় ২০টি প্রজাতির রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে।খুলনার খালিশপুর থেকে ঢাকার কাটাবন পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ীরা নিয়মিত তাঁর কাছ থেকে মাছ সংগ্রহ করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার এলে অক্সিজেন প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে নিরাপদে মাছ পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। জাতভেদে এসব সৌখিন মাছ প্রতি জোড়া বা পিস ২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।রাহুল বিশ্বাস জানান, সৌখিন মাছের বাজার সারা বছরই সচল থাকে। তবে তাঁর উদ্যোগ শুধু রঙিন মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পারিবারিক ১৬ বিঘা জমির ওপর রয়েছে মোট নয়টি বড় পুকুর। এর মধ্যে আটটিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে শুধু পুরুষ জাতের (অল-মেল) গলদা এবং একটি পুকুরে ‘সিপি’ আধুনিক পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করছেন তিনি।পুকুরের পাড় ও আইলে চাষ করা হচ্ছে শসা, বরবটি, লাউসহ বিভিন্ন ধরনের বিষমুক্ত সবজি। পাশাপাশি প্রকল্পে রয়েছে গরুর প্রজনন কেন্দ্র, উন্নত বিদেশি জাতের কুকুর পালন এবং বাড়ির ছাদে বাহারি জাতের কবুতর প্রজনন ও বিপণন কেন্দ্র।নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে তরুণ উদ্যোক্তা রাহুল বিশ্বাস বলেন, “আমার এই খামারে বর্তমানে ছয়জন নিয়মিত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আমিও সার্বক্ষণিক শ্রম দিই। সব ধরনের আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা থাকে।”রাহুলের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা। ডুমুরিয়ার সফল গলদা-বাগদা চাষি ও কলেজ শিক্ষক নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, “রঙিন মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক বিপণনে রাহুল যে উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, তা এই অঞ্চলের বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয়। চিংড়ি ও সবজি চাষেও তিনি দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন।”ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান রিগ্যান বলেন, “চিংড়ি প্রধান ডুমুরিয়ায় সৌখিন রঙিন মাছ চাষের ধারণাটি বেশ সম্ভাবনাময়। রাহুল বিশ্বাস যেভাবে পেশাদারিত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল-মেল গলদা ও রঙিন মাছের সমন্বিত চাষ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা মৎস্য দপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা তাঁর মতো উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”স্থানীয়দের মতে, প্রচলিত কৃষি ও মৎস্য চাষের পাশাপাশি নতুন ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে রাহুল বিশ্বাস শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হননি, বরং অন্য তরুণদের জন্যও তৈরি করেছেন আত্মকর্মসংস্থানের অনুপ্রেরণার উদাহরণ।

সমন্বিত খামারে যুবক রাহুলের বাজিমাত, বছরে আয় ১৫-২০ লাখ টাকা