সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং অর্থনৈতিক সংকটের পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের সামনে রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠন, অর্থনীতি সচল করা, জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রথম ছয় মাসে নির্বাচনী অঙ্গীকারের বড় একটি অংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, আবার কিছু ক্ষেত্রে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলেও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা দাবি করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের মূল্যায়নে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও সরকারি সেবার মান এখনো সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগসরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো নানা সমস্যা ছিল। এসব মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিল্প উৎপাদন সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।সরকারের দাবি, ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রমে আধুনিকায়ন আনা হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও চাঁদাবাজি থেকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।এ সময়ে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।বন্ধ শিল্প চালুর উদ্যোগকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় শিল্পকে গতিশীল করতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪টি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি পাটকল পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।চীন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতাকেও সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ ও কৃষক কার্ডকৃষি খাতে প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তায় কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।এ ছাড়া সার, বীজ ও বিদ্যুৎ ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং আয় বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে এ কর্মসূচির।দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচিও পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে সেচ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো হবে।জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনজুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে সরকার। শহীদ পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতার ব্যবস্থা এবং আহতদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।সরকারের দাবি, গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩ হাজার আহতের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী এবং পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।সংসদ ও আইন প্রণয়নে গতিসরকারের আরেকটি বড় দাবি জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তোলা। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ৫২টি সংসদীয় কার্যদিবসে ১০৫টি বিল পাস হয়েছে।এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসরকার দাবি করছে, দীর্ঘদিনের গুম, খুন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও চাঞ্চল্যকর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আইনগত প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতির কথাও জানিয়েছে সরকার।তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি আনতে আরও কার্যকর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।ফ্যামিলি কার্ডে সামাজিক সুরক্ষানিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে ৬৭ হাজারের বেশি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে অন্তত ৪১ লাখ নারীকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।এ ছাড়া সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি ১৫ লাখ চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।মানুষের প্রত্যাশা এখনো দ্রব্যমূল্য ও কর্মসংস্থান ঘিরেসরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বড় অংশ এখনো দ্রব্যমূল্য, আয়, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তাকে ঘিরে।ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের বক্তব্য—দাম কিছুটা কমলেও আয় না বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বড় চাপ। কৃষকদের প্রত্যাশা উৎপাদন খরচ কমানো ও ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তরুণদের প্রধান দাবি নতুন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি।বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।সামনে সরকারের পরিকল্পনাসরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ছয় মাসে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও গতি বাড়ানো হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা উন্নয়ন, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশন, প্রশাসনে জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে এককথায় সফল বা ব্যর্থ বলা কঠিন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া সরকারের জন্য প্রথম ছয় মাস ছিল ভিত্তি তৈরির সময়। তবে আগামী ছয় মাসেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—ঘোষিত পরিকল্পনা ও নীতিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনে রূপ দেওয়া।মানুষ এখন দেখতে চায়—সরকার কী করতে চায়, তা নয়; সরকার আসলে কী করতে পারে।