নজর বিডি

সারাদিন ঘাম বিক্রি, চলে সংসার

কাক ডাকা ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ড মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন শতাধিক নারী-পুরুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ আবার খালি হাতেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। সবার লক্ষ্য একটাই—দিনের জন্য একটি কাজ জোটানো।এটি কোনো পশুর হাট নয়, পণ্যের বাজারও নয়। এটি শ্রমের হাট—যেখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণশ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কৃষিশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিনমজুররা। স্থানীয়দের ভাষায় এটি ভাড়াটে ‘শ্রমিকের হাট’, যেখানে মানুষই যেন পণ্য আর শ্রমই তাদের বিক্রির একমাত্র সম্বল।সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়ে এই হাট চলে প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। এ সময় ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন এমন ব্যক্তিরা এসে শ্রমিকদের সঙ্গে দরদাম করেন। কাজের ধরন ও শ্রমিকের দক্ষতা অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করে তাদের নিয়ে যান।একই চিত্র দেখা যায় উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, বিমানবন্দর ও টঙ্গী রেলস্টেশন মোড়েও। ভোর থেকে কাজের আশায় সেখানে অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর নারী-পুরুষ। কাজ মিললে দিনটি ভালো কাটে, আর কাজ না পেলে খালি হাতেই মুখ কালো করে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের।ভোরেই শুরু হয় অপেক্ষাসোমবার সকালে উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকদের কারও বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর, আবার কারও বয়স ৩৫ থেকে ৫৫ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই তাদের কাজের গতি কিংবা সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও নিত্যদিনের খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই শ্রমের হাটে।সূর্য একটু ওপরে উঠতেই হাট ফাঁকা হতে শুরু করে। যারা কাজ পান, তারা চলে যান নির্মাণস্থল, কৃষিজমি কিংবা মাটি কাটার কাজে। আর যারা কাজ পান না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে—পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি, মাসিক বেতন কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই শুধু এক দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন।‘ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই’পঞ্চগড় এলাকার নির্মাণশ্রমিক ও বর্তমানে টঙ্গীতে বসবাসরত মো. বাবুল মিয়া বলেন, “প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়।”তিনি জানান, বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ভারী কাজের ক্ষেত্রে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। আর নারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে। তবে প্রতিদিন সমান কাজ থাকে না।কাজ না থাকলে সংসারে সংকটউত্তরার আজমপুরের বাসিন্দা মো. সেলিম কবিরসহ একাধিক শ্রমিক জানান, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও তৈরি হয়।তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী। এক দিন কাজ না হলে সেদিনের বাজার-খরচও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।শ্রমিক আজাদ রহমান ও বদরুল আলম বলেন, “আমাদের কোনো মাসিক বেতন নেই, ভাতাও নেই। আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়। দিন আনি, দিন খাই।”আরেক শ্রমিক মানিক খান ওরফে মানিক বলেন, “সকালে সবাই সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে, সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।”শ্রমিক নিতে আসেন ঠিকাদার, বাড়ির মালিকপ্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন এই হাটে। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি মজুরিও পাওয়া যায়।তুরাগের চণ্ডালভোগ এলাকার বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, “বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে। তবে আগের চেয়ে দিনমজুরের চাহিদা ও কাজের দরদাম বেড়েছে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা কম।”‘ভালো শ্রমিক পেতে বেশি মজুরি দিতে হয়’স্থানীয় ঠিকাদার মিজানুর রহমান ও জুয়েল বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে কিছুটা বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় কাজের বাজার কিছুটা মন্দ। উত্তরার এই শ্রমিকের হাটে আগের চেয়ে দিনমজুরের সংখ্যা তুলনামূলক বেড়েছে বলেও জানান তারা।কাজের নিশ্চয়তা নেই, মাসিক বেতন নেই, নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা। তবুও ভোর হলেই কোদাল-বেলচা হাতে উত্তরার বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে যান এসব শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কাছে প্রতিটি সকাল নতুন একটি আশার নাম—আজ হয়তো কাজ মিলবে, আজ হয়তো সংসারের চুলায় আগুন জ্বলবে।

সারাদিন ঘাম বিক্রি, চলে সংসার