নজর বিডি

সোশ্যাল মিডিয়ার চোরাবালি ও বিভ্রান্ত তরুণ প্রজন্ম: সংকটের মনস্তাত্ত্বিক জ্যামিতি ও উত্তরণের পথ

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়ক ধরে মানবসভ্যতা যখন নতুন এক দিগন্তে প্রবেশ করেছিল, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে সেই প্রযুক্তিই যেন অনেক ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের উৎস হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অভিভাবক, শিক্ষক, সুশীল সমাজ ও চিন্তক মহলের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতে অতিমাত্রায় নিমগ্ন হয়ে পড়া।যে বয়সে তরুণদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটার কথা, সেই বয়সে অনেকেই দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে স্ক্রিনের সামনে। একজন শিক্ষাবিদ ও অপরাধ সমাজবিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে এই প্রবণতার দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগের। অনিয়ন্ত্রিত ও নেতিবাচক ডিজিটাল পরিবেশ তরুণদের আচরণ, মূল্যবোধ এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।সংকটের সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। ফলে অপরিণত বয়সের একজন ব্যবহারকারী খুব সহজেই নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্টের একটি বদ্ধ বলয়ের মধ্যে আটকে যেতে পারে। অপরাধবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি কয়েকটি তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়।১. অ্যানোমি বা সামাজিক আদর্শহীনতাসমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের ‘অ্যানোমি’ তত্ত্ব বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্কৃতির একটি দিক ব্যাখ্যায় প্রাসঙ্গিক। ভার্চুয়াল জগতে যখন লাইক, কমেন্ট ও ভিউয়ের মতো তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি বাস্তব জীবনের সামাজিক মূল্যবোধ ও অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তরুণদের মধ্যে প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।এই বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার প্রতি উদাসীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।২. ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন তত্ত্বঅপরাধবিজ্ঞানী এডউইন সাদারল্যান্ডের ‘ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধমূলক আচরণ অনেকাংশে সামাজিক যোগাযোগ ও পরিবেশের মাধ্যমে শেখা যায়।বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের এমন এক বিশাল ভার্চুয়াল পরিসর দিয়েছে, যেখানে তারা বিভিন্ন ধরনের আচরণ ও মতাদর্শের সংস্পর্শে আসে। গ্যাং সংস্কৃতি, সাইবার বুলিং, সহিংসতার প্রদর্শন কিংবা অপরাধকে মহিমান্বিত করার প্রবণতা তরুণদের একটি অংশকে নেতিবাচক আচরণ অনুকরণে প্রভাবিত করতে পারে।৩. হাইপার-রিয়েলিটি ও পরিচয় সংকটফরাসি দার্শনিক জঁ বদ্রিলারের ‘হাইপার-রিয়েলিটি’ ধারণার আলোকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বাস্তবতার একটি কৃত্রিম ও অতিরঞ্জিত সংস্করণ হিসেবে দেখা যায়। ফিল্টার করা জীবন, সাজানো সাফল্য ও কৃত্রিম জনপ্রিয়তার প্রদর্শন তরুণদের মধ্যে বাস্তব জীবন সম্পর্কে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।ভার্চুয়াল পরিচয় ও বাস্তব জীবনের অবস্থানের মধ্যে যখন বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়, তখন হতাশা, হীনম্মন্যতা ও পরিচয় সংকট দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব মানসিক চাপ তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ বা আত্মবিধ্বংসী আচরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।৪. কিশোর গ্যাং ও সাব-কালচারাল থিওরিঅপরাধবিজ্ঞানের ‘সাব-কালচারাল থিওরি’ ব্যাখ্যা করে কীভাবে মূলধারার সমাজের বাইরে তরুণদের মধ্যে আলাদা মূল্যবোধ ও আচরণগত সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রুপ, অনলাইন প্রতিযোগিতা ও ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে আগ্রাসী দলগত পরিচয় তৈরি করতে পারে। ভার্চুয়াল দ্বন্দ্ব বা আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা বাস্তব জীবনে সহিংসতা, মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যান্য অপরাধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।উত্তরণের পথ: প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক পরিকল্পনাতরুণ প্রজন্মকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ।১. পারিবারিক দূরত্বের অবসান ও কোয়ালিটি টাইমপরিবারই নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রথম শিক্ষালয়। সমাজবিজ্ঞানী চার্লস কুলির ‘প্রাইমারি গ্রুপ’ ধারণা অনুযায়ী, ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সন্তানের হাতে শুধু স্মার্টফোন তুলে দিয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। তাদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটাতে হবে, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে হবে এবং ডিজিটাল জগতের বাইরে একটি আনন্দময় ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।২. ডিজিটাল লিটারেসি ও মূল্যবোধের শিক্ষাশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সুফল ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, তথ্য যাচাই ও সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।৩. খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণতরুণদের স্ক্রিননির্ভরতা কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হলো তাদের মাঠ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা।প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক, নাটক, সংগীত ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এসব কার্যক্রম তাদের সৃজনশীল শক্তিকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে পারে।৪. সাইবার অপরাধ দমন ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থাসাইবার অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও দক্ষ, আধুনিক ও সংবেদনশীল হতে হবে। তবে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।অপরাধবিজ্ঞানের ‘রিস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার আলোকে তাদের জন্য মানসিক কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও আধুনিক কিশোর সংশোধনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লক্ষ্য হতে হবে তাদের অপরাধী হিসেবে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করা নয়; বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।তরুণদের রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে রক্ষাআমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে কোনো অভিশাপ নয়; এর ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়।পরিবার, শিক্ষক, সমাজচিন্তক, প্রযুক্তিবিদ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগে তরুণদের প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক থেকে সুরক্ষিত রেখে ইতিবাচক ও সৃজনশীল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।আমাদের সন্তানদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম মায়াজাল থেকে বের করে বাস্তব জীবনের মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ আজকের তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার অর্থই হলো আগামী দিনের মেধাভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে রক্ষা করা।

সোশ্যাল মিডিয়ার চোরাবালি ও বিভ্রান্ত তরুণ প্রজন্ম: সংকটের মনস্তাত্ত্বিক জ্যামিতি ও উত্তরণের পথ