নজর বিডি

লাগামহীন ‘মব কালচার’: রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে গণমাধ্যম ও জননিরাপত্তা

মোঃ অলি উদ্দিন মিলন | ঢাকা১৯ মে, ২০২৬বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’—অর্থাৎ উচ্ছৃঙ্খল জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা—এবং গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন কর্তব্যরত সাংবাদিক, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। সরকারের বারবার আশ্বাস ও ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে এই মব কালচার বা উন্মত্ত জনতার সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না।মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা এবং সামাজিক অসহনশীলতাই এই সংকটের মূল কারণ।সাংবাদিকদের ওপর বাড়ছে হামলামানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনৈতিক উসকানি বা সংঘবদ্ধ মবের মাধ্যমে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। এমনকি দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়েও হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।মব সহিংসতায় বাড়ছে প্রাণহানিবিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই মব সহিংসতার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মব সহিংসতায় ১৯ জন নিহত হলেও এপ্রিল মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ জনে। গত এক বছরেই গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬৮ জন। আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক মানুষ।আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে তাৎক্ষণিক জনরোষ সৃষ্টি এবং প্রশাসনের ধীর প্রতিক্রিয়া এসব ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক দুর্বলতাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ জনতা দিয়ে হেনস্তা, অপদস্থ কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক মহল এসব ঘটনাকে ‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সুশীল সমাজ একে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা দফায় দফায় সতর্ক করে বলেছেন, দাবি-দাওয়ার নামে কোনো ধরনের মব কালচার বরদাশত করা হবে না এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।একই সঙ্গে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও মব জাস্টিস বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।সংকটের মূল কারণরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এখন তারই এক বিকৃত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জনতার হাতে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে তাৎক্ষণিক ‘শাস্তি’ দেওয়ার মানসিকতায় ঝুঁকছে।অন্যদিকে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর তৎপরতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে মব তৈরি করে সহিংসতা চালানোর সাহস পাচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীগুলো।বিশেষজ্ঞদের পরামর্শবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে—মব সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ সুরক্ষা সেল গঠন করা প্রয়োজন।সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সচেতন নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।গুজব প্রতিরোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত তথ্য যাচাই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উন্মত্ত জনতার এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি এখনই কঠোরভাবে দমন করা না যায়, তবে দেশের বাকস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

লাগামহীন ‘মব কালচার’: রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঝুঁকিতে গণমাধ্যম ও জননিরাপত্তা