নজর বিডি

সনদসর্বস্ব শিক্ষার বৃত্ত ভেঙে: লক্ষ্য হোক সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ও মানুষ গঠন

সমকালীন বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে প্রায়শই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জন কিংবা বৃত্তিমূলক কর্মসংস্থানের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ ও সংকীর্ণ উপযোগিতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানবসভ্যতার মৌলিক চেতনাকে ব্যাহত করছে। আমার দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি— শিক্ষার প্রকৃত পরিধি ও উদ্দেশ্য এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও গভীর। একে কেবল জীবিকা অর্জনের হাতিয়ারে রূপান্তর করলে শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যায়।মহান বিজ্ঞানী Albert Einstein যথার্থই বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো এমন এক বিষয়, যা বিদ্যালয়ে শেখানো সব কিছু ভুলে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকে।” অর্থাৎ, প্রকৃত শিক্ষা কোনো সাময়িক মুখস্থ বিদ্যা বা কাগুজে সার্টিফিকেট নয়; এটি মানুষের মজ্জাগত সংস্কার ও বোধের বিকাশ।আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার প্রকৃত সুফল এবং এর প্রায়োগিক ও নৈতিক সার্থকতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের ‘ইসলামিক ইথিক্স’ বা ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিশাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। যে শিক্ষায় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার স্থান নেই, তা সমাজকে আলোর বদলে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।ইসলামের মহান নবী Muhammad মানবজাতির কল্যাণে প্রকৃত ও ফলপ্রসূ শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি উম্মতকে এমন জ্ঞান অর্জন থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন, যা কোনো উপকারে আসে না। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করছি এবং অপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। এই বাণী স্পষ্ট করে দেয়, যে শিক্ষার কোনো আত্মিক ও সামাজিক কল্যাণ নেই এবং যা মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে না, তা প্রকৃত অর্থে অর্থবহ নয়।ইসলামি নীতিশাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যক্তির ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়ে তাকে তাকওয়া, খোদাভীতি ও মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ করে তোলা। মনীষী Swami Vivekananda-এর ভাষায়, “শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ।” প্রতিটি মানুষের মাঝেই এক একটি সম্ভাবনার বীজ নিহিত থাকে। প্রকৃত শিক্ষার কাজ হলো সেই সুপ্ত মেধা ও গুণাবলীর বিকাশ ঘটানো।শিক্ষা মানুষকে অন্ধ অনুসরণ থেকে বেরিয়ে এসে যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে শেখায়, নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং সামষ্টিক কল্যাণে আত্মনিয়োগের মানসিকতা তৈরি করে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা কেবল ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত পূর্ণাঙ্গ, সংবেদনশীল, বিবেকবান ও নৈতিক গুণসম্পন্ন বিশ্বনাগরিক তৈরি করা।দার্শনিক Socrates যেমনটি বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন এবং সত্যের আবিষ্কার।”সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী A. P. J. Abdul Kalam বলেছিলেন, “শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষতার পাশাপাশি ভালো মানুষ তৈরি করা।” এই দর্শনের ভিত্তিতেই জ্ঞান অর্জনের চরম সার্থকতা তখনই অর্জিত হয়, যখন সেই জ্ঞান মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান— কেবল জিপিএ কিংবা সিজিপিএ অর্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন না। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ইসলামি নৈতিকতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একজন দক্ষ, সৃজনশীল ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করুন। কারণ, প্রায়োগিক উপযোগিতা এবং আত্মিক ও নৈতিক চেতনার সমন্বয় ছাড়া অর্জিত জ্ঞান সমাজ বা রাষ্ট্র— কারোর জন্যই স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।আসুন, সনদসর্বস্ব শিক্ষার সংকীর্ণতা ভেঙে আমরা মেধা, মনন ও নৈতিকতার সমন্বিত বিকাশে সচেষ্ট হই।লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজানভাইসচ্যান্সেলর, Darus Salam University, সোমালিয়া।

সনদসর্বস্ব শিক্ষার বৃত্ত ভেঙে: লক্ষ্য হোক সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ও মানুষ গঠন