নজর বিডি

অর্থই যেখানে কবরের নিরাপত্তার শর্ত

অর্থই যেখানে কবরের নিরাপত্তার শর্ত
নিশ্চিত মৃত্যুর পর মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল কবর হলেও, সেখানেও গড়ে উঠেছে এক নির্মম বাণিজ্যব্যবস্থা। রাজধানীর আজিমপুর, খিলগাঁও ও জুরাইন কবরস্থানে মৃত্যুর পরও স্বজনদের গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা—কেবল একটি "ভালো জায়গায়" প্রিয়জনকে শায়িত করতে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীন এই তিন কবরস্থানে প্রতিটি দাফনের জন্য নিবন্ধন ফি হিসেবে করপোরেশন নিলেও বাকি সবকিছু পরিচালিত হয় ইজারাদারদের মাধ্যমে। আর এই ইজারা প্রক্রিয়া ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক শোষণের চক্র। সরকারি দরপত্র অনুযায়ী বড় কবর খননের জন্য খরচ মাত্র ২ টাকা থেকে ১১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাঁশের দাম ৫ থেকে ১৭ টাকা, চাটাইয়ের দাম ১৩ টাকা। অথচ বাস্তবে, একটি কবর খনন করতে খরচ হয় ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত, নির্ভর করে জায়গা, সময় এবং স্বজনদের "ক্ষমতা"র ওপর। তিনটি কবরস্থানের ইজারা তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের হলেও, বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ করছেন একজনই—সুমন ইসলাম। তার নিয়ন্ত্রণাধীন গোরখোদকরা সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও ‘ভালো জায়গায়’ কবর দিতে, ঘাস লাগাতে, বা কবরটি সংরক্ষণ রাখতে নিয়মিত টাকা দাবি করেন। অনেকে অভিযোগ করেন, মাসে মাসে টাকা না দিলে কবরটিই হারিয়ে যায়। গোরখোদকরা জানান, ঠিকাদারের কাছ থেকে তারা নির্ধারিত কোনো পারিশ্রমিক পান না। ফলে তাদের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায় মৃত ব্যক্তির স্বজনদের দেওয়া বকশিশ বা ‘চাঁদা’। অনেক সময় এক কবর খননেই ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। আজিমপুর কবরস্থানে নিয়মিত যাওয়া আতিয়ার মোল্লা বলেন, স্ত্রীর কবর টিকিয়ে রাখতে তাকে মাসে মাসে টাকা দিতে হয়, নইলে পরিচর্যা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি কবরটিও হারিয়ে যায়। এক স্বজনের কবর এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর কোনো ঝুঁকি নেননি। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কবর খনন, বাঁশ, ও চাটাইয়ের নির্ধারিত দাম কবরস্থানে টানিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, এসব নিয়ম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মৃত্যুর পরও যদি অর্থের জালে আটকে থাকতে হয়, তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সমাজ কতটা মানবিক? কবর যেখানে চিরশান্তির জায়গা, সেখানে কেন গড়ে উঠেছে এতো অশান্ত এক অর্থনৈতিক দানব? চলমান এ দুর্নীতির লাগাম টানতে কার্যকর মনিটরিং, স্বচ্ছ ইজারা প্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ বাড়ানো জরুরি—না হলে মৃত্যুর পরও মানুষ থাকবে অসহায়, আর বাণিজ্য হবে অব্যাহত।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


অর্থই যেখানে কবরের নিরাপত্তার শর্ত

প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৫

featured Image
নিশ্চিত মৃত্যুর পর মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল কবর হলেও, সেখানেও গড়ে উঠেছে এক নির্মম বাণিজ্যব্যবস্থা। রাজধানীর আজিমপুর, খিলগাঁও ও জুরাইন কবরস্থানে মৃত্যুর পরও স্বজনদের গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা—কেবল একটি "ভালো জায়গায়" প্রিয়জনকে শায়িত করতে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীন এই তিন কবরস্থানে প্রতিটি দাফনের জন্য নিবন্ধন ফি হিসেবে করপোরেশন নিলেও বাকি সবকিছু পরিচালিত হয় ইজারাদারদের মাধ্যমে। আর এই ইজারা প্রক্রিয়া ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক শোষণের চক্র। সরকারি দরপত্র অনুযায়ী বড় কবর খননের জন্য খরচ মাত্র ২ টাকা থেকে ১১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাঁশের দাম ৫ থেকে ১৭ টাকা, চাটাইয়ের দাম ১৩ টাকা। অথচ বাস্তবে, একটি কবর খনন করতে খরচ হয় ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত, নির্ভর করে জায়গা, সময় এবং স্বজনদের "ক্ষমতা"র ওপর। তিনটি কবরস্থানের ইজারা তিনটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের হলেও, বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ করছেন একজনই—সুমন ইসলাম। তার নিয়ন্ত্রণাধীন গোরখোদকরা সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়াও ‘ভালো জায়গায়’ কবর দিতে, ঘাস লাগাতে, বা কবরটি সংরক্ষণ রাখতে নিয়মিত টাকা দাবি করেন। অনেকে অভিযোগ করেন, মাসে মাসে টাকা না দিলে কবরটিই হারিয়ে যায়। গোরখোদকরা জানান, ঠিকাদারের কাছ থেকে তারা নির্ধারিত কোনো পারিশ্রমিক পান না। ফলে তাদের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায় মৃত ব্যক্তির স্বজনদের দেওয়া বকশিশ বা ‘চাঁদা’। অনেক সময় এক কবর খননেই ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। আজিমপুর কবরস্থানে নিয়মিত যাওয়া আতিয়ার মোল্লা বলেন, স্ত্রীর কবর টিকিয়ে রাখতে তাকে মাসে মাসে টাকা দিতে হয়, নইলে পরিচর্যা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি কবরটিও হারিয়ে যায়। এক স্বজনের কবর এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পর তিনি আর কোনো ঝুঁকি নেননি। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কবর খনন, বাঁশ, ও চাটাইয়ের নির্ধারিত দাম কবরস্থানে টানিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা হলো, এসব নিয়ম কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মৃত্যুর পরও যদি অর্থের জালে আটকে থাকতে হয়, তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সমাজ কতটা মানবিক? কবর যেখানে চিরশান্তির জায়গা, সেখানে কেন গড়ে উঠেছে এতো অশান্ত এক অর্থনৈতিক দানব? চলমান এ দুর্নীতির লাগাম টানতে কার্যকর মনিটরিং, স্বচ্ছ ইজারা প্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিযোগ করার সুযোগ বাড়ানো জরুরি—না হলে মৃত্যুর পরও মানুষ থাকবে অসহায়, আর বাণিজ্য হবে অব্যাহত।

নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত