দেশে ভোজ্যতেলের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর, যার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং ভোজ্যতেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে খুলনাঞ্চলের পতিত ও লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষে বড় ধরনের সফলতা আসছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উপকূলীয় অঞ্চলের চাষিদের হাত ধরে এখন লবণাক্ত জমিতে হাসছে সূর্যমুখী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের সহায়তায় খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, খুলনা, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট—এই চার জেলা নিয়ে গঠিত খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমিই লবণাক্ত। সাধারণত আমন ধান কাটার পর খরিপ–১ মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ) প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণাক্ততা থাকলে জমিকে চাষের অনুপযোগী বলা হয়। কিন্তু সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ফলে উপকূলের পতিত জমি আবাদের আওতায় আনার জন্য সূর্যমুখী এখন অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল।”
খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রদর্শনী মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সূর্যমুখীর চোখজুড়ানো ফলন হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতিতে হলুদ রঙের গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। মাঠে বাতাসে দুলছে বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের হাজার হাজার ফুল।
বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার আটজুড়ী গ্রামের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমলা বিশ্বাস জানান, তাঁর এলাকার পেয়ারী বেগম, বাচ্চু মিয়া, নিজাম মোল্লাসহ কয়েকজন কৃষক ২ একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। সেখানে একেকটি ফুলের পরিধি প্রায় ১৫ ইঞ্চি এবং প্রতিটি হেটের (বীজের চাকতি) ওজন এক কেজিরও বেশি হয়েছে।
নড়াইল সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, “আগে আমন কাটার পর লবণ ওঠার ভয়ে জমি পতিত রাখতাম। এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে প্রথমবার সূর্যমুখী করে বাম্পার ফলন পেয়ে আমি নিজেই অবাক!” একই সুর খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নের আলকা গ্রামের চাষি রেজাউল করিমের। তিনি বলেন, “সূর্যমুখীতে সেচের পানি খুব কম লাগে। এবার ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে আশা করছি।”
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে বারি-৩ জাতের সূর্যমুখী চাষ করতে বীজ, সার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সরকারি প্রণোদনা (বীজ ও সার) পেলে কৃষকের নিজস্ব খরচ হয় মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো।
ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৭ থেকে ৮ মণ (প্রায় ৩০০ কেজি) বীজ পাওয়া যায়। এক কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম তেল নিষ্কাশন সম্ভব। সেই হিসাবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায়১৩০ লিটার তেল পাওয়া যাবে। প্রতি লিটার তেলের বাজারমূল্য ২৫০ টাকা ধরলে কমবেশি ৩২ হাজার টাকার তেল পাওয়া সম্ভব। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল ও শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করা যায়।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেন জানান, সাধারণ কৃষকদের অনীহা কাটাতে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট ও পুলিশ লাইন্সের পতিত জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। সেই ফলন দেখে এখন সাধারণ মানুষ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, সূর্যমুখী চাষে জমির উর্বরতাও বাড়ে। ধানের শিকড় যেখানে মাত্র ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে যায়, সূর্যমুখীর শিকড় যায় ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত। এর পাতা মাটিতে পচে চমৎকার জৈব সার তৈরি করে, যা পরবর্তী ফসলের খরচ কমিয়ে দেয়। ৮৫-১০৫ দিনের জীবনকাল হওয়ায় আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে এই চাষ করে এরপর পাট, তিল বা মুগডাল চাষ করা সম্ভব।
পার্টনার প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “দেশে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব হয়। যদি আমরা আমন পরবর্তী সময়ে পতিত ও লবণাক্ত জমির মাত্র ৫০ শতাংশেও সূর্যমুখীর আবাদ বাড়াতে পারি, তবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং আমরা তেল আমদানিকারকদের হাত থেকে রক্ষা পাব।”
তিনি আরও জানান, চলতি বছর খুলনা অঞ্চলে ১ হাজার ৬শ হেক্টর জমি সূর্যমুখী চাষের আওতায় এসেছে। 'পার্টনার' প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্লকে কৃষকদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া খুলনা অঞ্চলের কৃষি অভিযোজন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি উপজেলার জন্য ৮টি তেল নিষ্কাশন মেশিন দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলাতেই এই মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পার্টনার প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলনা অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সূর্যমুখী চাষের এই সুন্দর উদ্যোগ অনাবাদি জমির পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পুষ্টিকর সূর্যমুখী তেলকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করবে।”
বিষয় : নজরবিডি কৃষি সংবাদ

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
দেশে ভোজ্যতেলের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর, যার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং ভোজ্যতেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে খুলনাঞ্চলের পতিত ও লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষে বড় ধরনের সফলতা আসছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উপকূলীয় অঞ্চলের চাষিদের হাত ধরে এখন লবণাক্ত জমিতে হাসছে সূর্যমুখী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’ প্রকল্পের সহায়তায় খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, খুলনা, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট—এই চার জেলা নিয়ে গঠিত খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমিই লবণাক্ত। সাধারণত আমন ধান কাটার পর খরিপ–১ মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ) প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি পতিত থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণাক্ততা থাকলে জমিকে চাষের অনুপযোগী বলা হয়। কিন্তু সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ফলে উপকূলের পতিত জমি আবাদের আওতায় আনার জন্য সূর্যমুখী এখন অন্যতম সম্ভাবনাময় ফসল।”
খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রদর্শনী মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সূর্যমুখীর চোখজুড়ানো ফলন হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতিতে হলুদ রঙের গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। মাঠে বাতাসে দুলছে বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের হাজার হাজার ফুল।
বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার আটজুড়ী গ্রামের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমলা বিশ্বাস জানান, তাঁর এলাকার পেয়ারী বেগম, বাচ্চু মিয়া, নিজাম মোল্লাসহ কয়েকজন কৃষক ২ একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। সেখানে একেকটি ফুলের পরিধি প্রায় ১৫ ইঞ্চি এবং প্রতিটি হেটের (বীজের চাকতি) ওজন এক কেজিরও বেশি হয়েছে।
নড়াইল সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, “আগে আমন কাটার পর লবণ ওঠার ভয়ে জমি পতিত রাখতাম। এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে প্রথমবার সূর্যমুখী করে বাম্পার ফলন পেয়ে আমি নিজেই অবাক!” একই সুর খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নের আলকা গ্রামের চাষি রেজাউল করিমের। তিনি বলেন, “সূর্যমুখীতে সেচের পানি খুব কম লাগে। এবার ধানের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ হবে আশা করছি।”
কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে বারি-৩ জাতের সূর্যমুখী চাষ করতে বীজ, সার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সরকারি প্রণোদনা (বীজ ও সার) পেলে কৃষকের নিজস্ব খরচ হয় মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো।
ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৭ থেকে ৮ মণ (প্রায় ৩০০ কেজি) বীজ পাওয়া যায়। এক কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে ৪০০ গ্রাম তেল নিষ্কাশন সম্ভব। সেই হিসাবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায়১৩০ লিটার তেল পাওয়া যাবে। প্রতি লিটার তেলের বাজারমূল্য ২৫০ টাকা ধরলে কমবেশি ৩২ হাজার টাকার তেল পাওয়া সম্ভব। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল ও শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করা যায়।
খুলনার ফুলতলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেন জানান, সাধারণ কৃষকদের অনীহা কাটাতে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট ও পুলিশ লাইন্সের পতিত জমিতে আবাদ করা হয়েছিল। সেই ফলন দেখে এখন সাধারণ মানুষ উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, সূর্যমুখী চাষে জমির উর্বরতাও বাড়ে। ধানের শিকড় যেখানে মাত্র ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে যায়, সূর্যমুখীর শিকড় যায় ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত। এর পাতা মাটিতে পচে চমৎকার জৈব সার তৈরি করে, যা পরবর্তী ফসলের খরচ কমিয়ে দেয়। ৮৫-১০৫ দিনের জীবনকাল হওয়ায় আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে এই চাষ করে এরপর পাট, তিল বা মুগডাল চাষ করা সম্ভব।
পার্টনার প্রকল্পের খুলনা অঞ্চলের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “দেশে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব হয়। যদি আমরা আমন পরবর্তী সময়ে পতিত ও লবণাক্ত জমির মাত্র ৫০ শতাংশেও সূর্যমুখীর আবাদ বাড়াতে পারি, তবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং আমরা তেল আমদানিকারকদের হাত থেকে রক্ষা পাব।”
তিনি আরও জানান, চলতি বছর খুলনা অঞ্চলে ১ হাজার ৬শ হেক্টর জমি সূর্যমুখী চাষের আওতায় এসেছে। 'পার্টনার' প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্লকে কৃষকদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া খুলনা অঞ্চলের কৃষি অভিযোজন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি উপজেলার জন্য ৮টি তেল নিষ্কাশন মেশিন দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলাতেই এই মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পার্টনার প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খুলনা অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সূর্যমুখী চাষের এই সুন্দর উদ্যোগ অনাবাদি জমির পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পুষ্টিকর সূর্যমুখী তেলকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করবে।”

আপনার মতামত লিখুন