বাংলাদেশ
কুমিল্লা
এই প্রথমবারের মতো লাকসাম থানায় একজন নারী ওসি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন নাজনীন সুলতানা।
বিশেষ প্রতিনিধি মোঃ ছিরু মিয়া
প্রকাশঃ ১৬ জুন ২০২৫
কুমিল্লা জেলার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক রচিত হয়েছে। জেলার ১৭টি উপজেলা ও ১৮টি থানার কোনো একটি থানাতেও এর আগে কোনো নারী অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি গত বছরের ১০ অক্টোবর ২০২৪ সালে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে, কুমিল্লা জেলার পুলিশ ইতিহাসে তিনিই হলেন প্রথম নারী ওসি।
কুমিল্লা ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর জানান, ১৭৯০ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা (বর্তমান কুমিল্লা) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৬১ সালে এই অঞ্চলে পুলিশি ব্যবস্থা চালু হয়। এরপর কুমিল্লা কোতোয়ালি থানা গড়ে ওঠে, যার বয়স এখন দেড় শতাব্দীরও বেশি। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও এই জেলার কোনো থানায় নারী ওসি নিয়োগের দৃষ্টান্ত ছিল না। নাজনীন সুলতানার নিয়োগ এই দীর্ঘ ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা নাজনীন সুলতানা শিক্ষা জীবন শেষ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে। তিনি বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পাশাপাশি এলএলবি ডিগ্রিও অর্জন করেন। ২০০৭ সালে তিনি উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন এবং তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ফেনী জেলা থেকে। পরে ২০১৬ সালে তিনি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ২০১৮ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে গমন করেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।
লাকসাম থানার ৪০তম ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি, তবে নারী হিসেবে তিনিই প্রথম। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি স্থানীয় জনগণের সহানুভূতি ও সহায়তা পেয়েছেন। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তিনি জনগণের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে শুনে ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানান।
প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাজনীন সুলতানা বলেন,"চাকরিজীবনের শুরু থেকেই দেখেছি, মেয়েরা ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন খুবই কম করছেন। অনেকে সাহস পান না। কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করব। সেই স্বপ্ন এখন পূরণ হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন,"থানায় কেউ আসলে প্রথমেই আমি চেষ্টা করি তার সমস্যাটা মনোযোগ দিয়ে শুনতে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিই। আমি কোনো দলের পক্ষ নিই না, যেটা সঠিক মনে হয়, সেটাই করি।"
পুলিশে চাকরি করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাজনীন জানান,"পুলিশে চাকরি করব, সেটা কখনো ভাবিনি। আমার ভাই ২০০৫ সালে এসআই পদে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তবে মৌখিক পরীক্ষার পর চাকরি পাননি। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিল, তখন ভাই বললেন সুপারিশ লাগবে না, যোগ্যতায় চাকরি হবে। তখনই আবেদন করি এবং চাকরি হয়ে যায়।"
নাজনীন সুলতানার স্বামীও পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত আছেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ নাজনীন সুলতানার প্রশংসা করে বলেন,"আমি মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার দেখা সবচেয়ে দক্ষ ওসি হলেন নাজনীন সুলতানা।"
কুমিল্লার নারী অধিকার নেত্রী দিলনাশি মোহসেন জানান,"আমরা চাই, আরও বেশি নারী ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করুন। তবে এ ক্ষেত্রে যাঁদের পোস্টিং দেওয়া হবে, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে।"
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান,"নাজনীন সুলতানা এরই মধ্যে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। আমরা চাই, সামনে আরও কিছু থানায় নারী অফিসার ইনচার্জ পদায়ন করা হোক।"
আরও পড়ুনঃ
আপনার মতামত লিখুন