জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জন্য ঢাকায় বিনা মূল্যে ফ্ল্যাট প্রদানের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে। রাজধানীর মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে ১,৫৬০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ১,৩৪৪ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণরূপে সরকারের কোষাগার থেকে দেওয়া হবে।
আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ফ্ল্যাট, বিশেষ কক্ষ আহতদের জন্য এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ১,২৫০ বর্গফুট। প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে:
২টি শয়নকক্ষ (বেডরুম),একটি ড্রয়িংরুম,একটি লিভিংরুম,একটি খাবার কক্ষ,একটি রান্নাঘর এবং৩টি শৌচাগার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিটি ফ্ল্যাটে থাকবে একটি বিশেষ কক্ষ, যা শুধু আহত ব্যক্তি, বিশেষত যাঁরা পঙ্গু হয়েছেন বা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজাইন করা হবে। এই কক্ষে থাকবে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির জানান, এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ। ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকা পরে চূড়ান্ত করা হবে। তিনি জানান, জুলাই অধিদপ্তর, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বসে আহতদের ‘ভয়াবহতার মাত্রা’ অনুসারে ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকা তৈরি করবে। প্রকল্পটি ৪ বছরে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত ৪৯৩ জনকে ‘অতি গুরুতর আহত’ (ক শ্রেণি) এবং ৯০৮ জনকে ‘গুরুতর আহত’ (খ শ্রেণি) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গুরুতর আহতের তালিকায় আছেন ১,৪০১ জন।
এছাড়া শহীদ পরিবারদের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে আরও একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনে ৮০৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬২ কোটি টাকা। প্রতিটি ফ্ল্যাট হবে ১,৩৫৫ বর্গফুট আয়তনের এবং শহীদ পরিবারগুলো এই ফ্ল্যাটগুলো বিনামূল্যে পাবে।
আহতদের জন্য নির্ধারিত জমিটি মিরপুর হাউজিং এস্টেট এলাকায় অবস্থিত এবং এটি তুলনামূলকভাবে নিচু হওয়ায় জায়গা ভরাট করতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে একটি সরকারি সূত্র। জায়গাটি ব্যবহারের আগে উন্নয়ন প্রয়োজন হবে। যদিও ৫০ কোটির বেশি মূল্যের প্রকল্পে পূর্বসমীক্ষা বাধ্যতামূলক, এই প্রকল্পে তা এখনও করা হয়নি।
জুলাই আন্দোলনে ১৯ জন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, ৩৮২ জন এক চোখ হারিয়েছেন এবং অনেকে পা হারিয়েছেন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় ভবনগুলো নির্মাণে থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা:হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য র্যাম্প ও লিফট,ভেতরে পর্যাপ্ত চলাচল স্থান,সুরক্ষা ও সহায়ক হাতল,নিচতলায় প্রবেশাধিকারে বিশেষ ব্যবস্থা।এইসব সুবিধা নিশ্চিত করেই ১৫টি ভবনে মোট ১,৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে।
এই প্রকল্পের বিষয়ে ৭ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা আশা করছেন, জুলাই মাসের মধ্যেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় শহীদ ও আহতদের জন্য গ্রহণকৃত দুটি প্রকল্পই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে।
উল্লেখ্য, সরকার ইতোমধ্যে শহীদ ও আহত পরিবারকে এককালীন আর্থিক সহায়তা, সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ভাতা দিয়ে আসছে। ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প এ সহায়তার আরও একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন আহত ও শহীদ পরিবারগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ, অন্যদিকে এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন