নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ০৪ আগস্ট ২০২৫

বিশ্বজুড়ে গৃহহীনদের সংখ্যা ও বাংলাদেশের শহরায়নের চ্যালেঞ্জ

বিশ্বজুড়ে গৃহহীনদের সংখ্যা ও বাংলাদেশের শহরায়নের চ্যালেঞ্জ
মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সম্পাদক ও প্রকাশক, নজরবিডি

❀ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গৃহহীন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আর প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ, টেকসই ও পর্যাপ্ত বাসস্থানের বাইরে অবস্থান করছেন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, মাদক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, এবং সরকারি নীতির ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্য কারণ। বিশেষত কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে, অনেক দেশে বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশও গৃহহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক দেশে অভিবাসীদের জন্য আবাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তারা স্টেশন, পার্ক বা শেল্টারে বসবাস করছে।

❀ বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশে যদিও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী নির্দিষ্টভাবে গৃহহীনদের সংখ্যা তুলে ধরা হয় না, তথাপি নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বড় শহরগুলোতে প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ বস্তিতে, ফুটপাতে বা অনিরাপদ বাসস্থানে বসবাস করছে। ঢাকার কুড়িল, গাবতলী, কমলাপুর, শ্যামবাজার, সদরঘাট এলাকায় প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। গ্রামাঞ্চলে জমির দখল, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ বাসস্থান হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে, কিন্তু শহরে এসে পাচ্ছে না আবাসনের নিশ্চয়তা। ফলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে কিংবা উন্মুক্ত জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিচ্ছে।

❀ সরকার ও নীতির সীমাবদ্ধতা

সরকার ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘ভূমিহীনদের জন্য ঘর’ এবং ‘স্বপ্ননীড়’ নামক কিছু প্রকল্প চালু করলেও তা সার্বজনীন সমস্যা মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। নগর পরিকল্পনা, জমি ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয়ী আবাসন নীতিতে ঘাটতির কারণে শহরে গৃহহীনদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের জন্যও এখন নিজস্ব ফ্ল্যাট বা আবাসনের স্বপ্ন অনেকটাই ধোঁয়াশা।

❀ শহরায়নের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের শহরায়ন এখন ‘বিকল্পহীন’ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই শহরায়ন হচ্ছে অপরিকল্পিত ও বেসরকারি খাতনির্ভর, যেখানে আবাসন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা, না যোগাযোগ বা মানবিক বাসস্থান নিশ্চিত করা। সিটি কর্পোরেশন, রাজউক বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব প্রকট।

❀ করণীয়

  1. জাতীয় পর্যায়ে গৃহহীনদের জন্য জরিপ ও ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।
  2. সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নির্দিষ্ট জমি বরাদ্দ ও ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
  3. বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘর-ভিত্তিক সেবা, জল, পয়ঃনিষ্কাশন ও বৈদ্যুতিক সুবিধাসম্পন্ন করতে হবে।
  4. আবাসন খাতের ওপর কঠোর নীতিমালা ও জনসেবামূলক পরিকল্পনা জরুরি।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও গৃহহীনতা এখন একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং নীতির, পরিকল্পনার ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। শহরকে মানুষ-নির্ভর বাসযোগ্য করতে হলে, এখনই বাস্তবভিত্তিক, টেকসই এবং মানবিক পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।  

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


বিশ্বজুড়ে গৃহহীনদের সংখ্যা ও বাংলাদেশের শহরায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৫

featured Image
মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সম্পাদক ও প্রকাশক, নজরবিডি

❀ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গৃহহীন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আর প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ, টেকসই ও পর্যাপ্ত বাসস্থানের বাইরে অবস্থান করছেন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, মাদক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, এবং সরকারি নীতির ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্য কারণ। বিশেষত কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে, অনেক দেশে বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশও গৃহহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক দেশে অভিবাসীদের জন্য আবাসনের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তারা স্টেশন, পার্ক বা শেল্টারে বসবাস করছে।

❀ বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশে যদিও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী নির্দিষ্টভাবে গৃহহীনদের সংখ্যা তুলে ধরা হয় না, তথাপি নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ বড় শহরগুলোতে প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষ বস্তিতে, ফুটপাতে বা অনিরাপদ বাসস্থানে বসবাস করছে। ঢাকার কুড়িল, গাবতলী, কমলাপুর, শ্যামবাজার, সদরঘাট এলাকায় প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। গ্রামাঞ্চলে জমির দখল, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ বাসস্থান হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে, কিন্তু শহরে এসে পাচ্ছে না আবাসনের নিশ্চয়তা। ফলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে কিংবা উন্মুক্ত জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিচ্ছে।

❀ সরকার ও নীতির সীমাবদ্ধতা

সরকার ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘ভূমিহীনদের জন্য ঘর’ এবং ‘স্বপ্ননীড়’ নামক কিছু প্রকল্প চালু করলেও তা সার্বজনীন সমস্যা মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। নগর পরিকল্পনা, জমি ব্যবস্থাপনা ও সাশ্রয়ী আবাসন নীতিতে ঘাটতির কারণে শহরে গৃহহীনদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের জন্যও এখন নিজস্ব ফ্ল্যাট বা আবাসনের স্বপ্ন অনেকটাই ধোঁয়াশা।

❀ শহরায়নের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের শহরায়ন এখন ‘বিকল্পহীন’ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই শহরায়ন হচ্ছে অপরিকল্পিত ও বেসরকারি খাতনির্ভর, যেখানে আবাসন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুনাফা, না যোগাযোগ বা মানবিক বাসস্থান নিশ্চিত করা। সিটি কর্পোরেশন, রাজউক বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাব প্রকট।

❀ করণীয়

  1. জাতীয় পর্যায়ে গৃহহীনদের জন্য জরিপ ও ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।
  2. সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নির্দিষ্ট জমি বরাদ্দ ও ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।
  3. বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘর-ভিত্তিক সেবা, জল, পয়ঃনিষ্কাশন ও বৈদ্যুতিক সুবিধাসম্পন্ন করতে হবে।
  4. আবাসন খাতের ওপর কঠোর নীতিমালা ও জনসেবামূলক পরিকল্পনা জরুরি।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও গৃহহীনতা এখন একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং নীতির, পরিকল্পনার ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। শহরকে মানুষ-নির্ভর বাসযোগ্য করতে হলে, এখনই বাস্তবভিত্তিক, টেকসই এবং মানবিক পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।  

নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত