নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

নোয়াখালীতে ঝুপড়ি ঘরে ভূমিহীন পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

নোয়াখালীতে ঝুপড়ি ঘরে ভূমিহীন পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

দূর থেকে মনে হবে, পরিত্যক্ত কোনো কুঁড়েঘর। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়—এখানে মানুষের বসবাস। অসুস্থ বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তান নিয়ে এ ঘরেই কাটছে ফেরদৌসী বেগমদের জীবন-সংসার। ভাঙা টিন, ছেঁড়া বেড়া, কাঁধামাটির মেঝে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এ ঘরে থাকার মতো কিছু নেই। অথচ এটাই আশ্রয়হীন ফেরদৌসী বেগমের পরিবারের থাকার ঠিকানা।

ভাঙাচোরা ঝুপড়ি ও জীবনযাত্রা

দিনের বেলায় একটু স্বস্তি পেলেও সন্তানদের নিয়ে ঘর ভেঙে পড়ার ভয়ে রাত কাটে তাদের। ঝড়-বৃষ্টিতে বারবার ঘর উড়ে যায়। খড়কুটো দিয়ে আবারও মেরামত করেই বসবাস করছেন তারা। নোয়াখালী সদর উপজেলার ১১নং নেয়াজপুর ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের নেয়ামতপুর গ্রামের সর্দার বাড়ি সংলগ্ন খালপাড়ের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা ফেরদৌসী বেগমের ঝুপড়ি।

[caption id="attachment_14834" align="alignnone" width="336"] হাঁটুপানি পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয় ,ছবি:নজরবিডি[/caption]

সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, ঝুপড়ি ঘরে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই, হাটু–কোমর সমান পানি মাড়িয়ে যেতে হয়। এক কক্ষ বিশিষ্ট ঘরের ভিতরে পানি, ভাঙা টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি তাদের ঘর। এই পরিবারের নেই কোন জমি, নেই পাকা ঘর—যা আছে তা হলো চটের বেড়া আর ভাঙা টিনের ভাঙা ছাউনি দিয়ে তৈরি একটি আশ্রয়।

কঠিন আবহাওয়া ও অসুস্থতা

বর্ষায় টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে, শীতে কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাস ঢুকে, গ্রীষ্মে ঘর আগুনের মতো গরম হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে এখানে দিন কাটছে তাদের। ঘরের ভেতরেই চলছে ফেরদৌসীদের জীবনযাপন।

ভোর হলেই ফেরদৌসী বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কখনো অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ, কখনো দিনমজুরি। যে টাকা আসে, তা দিয়েই চলে সংসার। কিন্তু সবদিন খাবার জোটে না। অনেক রাত কেটে যায় সন্তানদের খালি পেট নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পায়নি পরিবারটি।

ফেরদৌসীর গল্প

ফেরদৌসী বেগম বলেন, “আমরা গরীব মানুষ—আমাগো থাকার মত কোন ঘর নাই, জমিও নাই। তাই খাল পাড়ের এই খাসজমিতে আশ্রয় নিয়েছি। এর আগে প্রায় ১৫ বছর অশ্বদিয়া ইউনিয়নের খাল পাড়ে এইভাবে বসবাস করেছি। খাল কাটার পরে সেখানে আর থাকতে পারিনি। প্রায় ৬ বছর ধরে এখানে থাকছি।”

চোখের পানি মুছতে মুছতে ফেরদৌসী আরো বলেন, “দিনমজুরি করে বাচ্চাদের মুখে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সব সময় পারি না। তবুও আল্লার কাছে প্রার্থনা করি, আমার অসুস্থ সন্তানরা যেন ভালো থাকে। ঝুপড়ি ঘরে ছেলে-মেয়ে নিয়ে রাত কাটাই। বর্ষার সময় ঘরে পানি পড়ে, তখন বসে রাত কাটাতে হয়। মানুষ বলে সরকার গরিব মানুষকে ঘর দেয়, আমাদের একটি ঘর দিলে উপকৃত হতাম।”

তিনি জানান, কয়েকমাস আগে খাল পাড়ের গাছ ভেঙে ঝুপড়ির উপর পড়ে, ফলে ঘর আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরের ভেতরের জীবন খুব কষ্টকর। টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে মাটিতে, শীতে কুয়াশা ও ঠান্ডা ঢুকে, গ্রীষ্মে টিনের তাপ দম বন্ধ করে দেয়। এতে সন্তানরা অসুস্থ, তিনিও অসুস্থ। স্বামী থেকেও কোন খোঁজ নেই।

অভাবের কারণে সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছেন না। “মানুষের সাহায্য-সহযোগীতা পেলে হয়তো বাঁচতে পারবো। সবার সাহায্যে হয়তো শান্তিতে থাকতে পারব,” তিনি জানান। সাহায্যের জন্য দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সকলের সহযোগিতা কামনা করছেন।
(ফেরদৌসী বেগমের বিকাশ ও নগদ পারসোনাল একাউন্ট: 0134-33 23 651)

বৃদ্ধা মা

ফেরদৌসী বেগমের মা বলেন, “বয়স্ক ভাতায় নাম আছে, কিন্তু এখন ভাতা পাচ্ছি না। আমার অত্যাধিক অ্যাজমা রোগের কারণে শ্বাসকষ্ট। ওষুধ কিনতে পারছি না।”

স্থানীয় বাসিন্দা মতিন বলেন, “ফেরদৌসী আপা ও তার পরিবার একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে। জীবনযাত্রা খুব কঠিন। হাটু–কোমর সমান পানির ভিতর দিয়ে যেতে হয়। তিন ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন। সবাই রোগাক্রান্ত। ২০২৪ সালের বন্যায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোনো সাহায্য পাননি।”

তাজুল ইসলাম স্বপন বলেন, “ফেরদৌসী বেগমের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ও বৃত্তবানদের তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও দেশ-বিদেশের বৃত্তবানদের সহযোগিতায় পরিবারটির জীবন পরিবর্তন হতে পারে। ঝুপড়ি মেরামত বা স্থায়ী ঘর দেওয়া যেতে পারে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন, “ওনারা ভূমিহীন, এটা মাত্র জানতে পারলাম। যদি তারা আবেদন করেন, আমরা যাচাই করে টিন বা ঘর দেয়ার চেষ্টা করব।”

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


নোয়াখালীতে ঝুপড়ি ঘরে ভূমিহীন পরিবারের মানবেতর জীবনযাপন

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫

featured Image

দূর থেকে মনে হবে, পরিত্যক্ত কোনো কুঁড়েঘর। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়—এখানে মানুষের বসবাস। অসুস্থ বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তান নিয়ে এ ঘরেই কাটছে ফেরদৌসী বেগমদের জীবন-সংসার। ভাঙা টিন, ছেঁড়া বেড়া, কাঁধামাটির মেঝে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এ ঘরে থাকার মতো কিছু নেই। অথচ এটাই আশ্রয়হীন ফেরদৌসী বেগমের পরিবারের থাকার ঠিকানা।

ভাঙাচোরা ঝুপড়ি ও জীবনযাত্রা

দিনের বেলায় একটু স্বস্তি পেলেও সন্তানদের নিয়ে ঘর ভেঙে পড়ার ভয়ে রাত কাটে তাদের। ঝড়-বৃষ্টিতে বারবার ঘর উড়ে যায়। খড়কুটো দিয়ে আবারও মেরামত করেই বসবাস করছেন তারা। নোয়াখালী সদর উপজেলার ১১নং নেয়াজপুর ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের নেয়ামতপুর গ্রামের সর্দার বাড়ি সংলগ্ন খালপাড়ের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা ফেরদৌসী বেগমের ঝুপড়ি।

[caption id="attachment_14834" align="alignnone" width="336"] হাঁটুপানি পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয় ,ছবি:নজরবিডি[/caption]

সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, ঝুপড়ি ঘরে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই, হাটু–কোমর সমান পানি মাড়িয়ে যেতে হয়। এক কক্ষ বিশিষ্ট ঘরের ভিতরে পানি, ভাঙা টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি তাদের ঘর। এই পরিবারের নেই কোন জমি, নেই পাকা ঘর—যা আছে তা হলো চটের বেড়া আর ভাঙা টিনের ভাঙা ছাউনি দিয়ে তৈরি একটি আশ্রয়।

কঠিন আবহাওয়া ও অসুস্থতা

বর্ষায় টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে, শীতে কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাস ঢুকে, গ্রীষ্মে ঘর আগুনের মতো গরম হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে এখানে দিন কাটছে তাদের। ঘরের ভেতরেই চলছে ফেরদৌসীদের জীবনযাপন।

ভোর হলেই ফেরদৌসী বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কখনো অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ, কখনো দিনমজুরি। যে টাকা আসে, তা দিয়েই চলে সংসার। কিন্তু সবদিন খাবার জোটে না। অনেক রাত কেটে যায় সন্তানদের খালি পেট নিয়ে। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পায়নি পরিবারটি।

ফেরদৌসীর গল্প

ফেরদৌসী বেগম বলেন, “আমরা গরীব মানুষ—আমাগো থাকার মত কোন ঘর নাই, জমিও নাই। তাই খাল পাড়ের এই খাসজমিতে আশ্রয় নিয়েছি। এর আগে প্রায় ১৫ বছর অশ্বদিয়া ইউনিয়নের খাল পাড়ে এইভাবে বসবাস করেছি। খাল কাটার পরে সেখানে আর থাকতে পারিনি। প্রায় ৬ বছর ধরে এখানে থাকছি।”

চোখের পানি মুছতে মুছতে ফেরদৌসী আরো বলেন, “দিনমজুরি করে বাচ্চাদের মুখে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সব সময় পারি না। তবুও আল্লার কাছে প্রার্থনা করি, আমার অসুস্থ সন্তানরা যেন ভালো থাকে। ঝুপড়ি ঘরে ছেলে-মেয়ে নিয়ে রাত কাটাই। বর্ষার সময় ঘরে পানি পড়ে, তখন বসে রাত কাটাতে হয়। মানুষ বলে সরকার গরিব মানুষকে ঘর দেয়, আমাদের একটি ঘর দিলে উপকৃত হতাম।”

তিনি জানান, কয়েকমাস আগে খাল পাড়ের গাছ ভেঙে ঝুপড়ির উপর পড়ে, ফলে ঘর আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরের ভেতরের জীবন খুব কষ্টকর। টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে মাটিতে, শীতে কুয়াশা ও ঠান্ডা ঢুকে, গ্রীষ্মে টিনের তাপ দম বন্ধ করে দেয়। এতে সন্তানরা অসুস্থ, তিনিও অসুস্থ। স্বামী থেকেও কোন খোঁজ নেই।

অভাবের কারণে সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছেন না। “মানুষের সাহায্য-সহযোগীতা পেলে হয়তো বাঁচতে পারবো। সবার সাহায্যে হয়তো শান্তিতে থাকতে পারব,” তিনি জানান। সাহায্যের জন্য দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সকলের সহযোগিতা কামনা করছেন।
(ফেরদৌসী বেগমের বিকাশ ও নগদ পারসোনাল একাউন্ট: 0134-33 23 651)

বৃদ্ধা মা

ফেরদৌসী বেগমের মা বলেন, “বয়স্ক ভাতায় নাম আছে, কিন্তু এখন ভাতা পাচ্ছি না। আমার অত্যাধিক অ্যাজমা রোগের কারণে শ্বাসকষ্ট। ওষুধ কিনতে পারছি না।”

স্থানীয় বাসিন্দা মতিন বলেন, “ফেরদৌসী আপা ও তার পরিবার একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে। জীবনযাত্রা খুব কঠিন। হাটু–কোমর সমান পানির ভিতর দিয়ে যেতে হয়। তিন ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন। সবাই রোগাক্রান্ত। ২০২৪ সালের বন্যায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোনো সাহায্য পাননি।”

তাজুল ইসলাম স্বপন বলেন, “ফেরদৌসী বেগমের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ও বৃত্তবানদের তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও দেশ-বিদেশের বৃত্তবানদের সহযোগিতায় পরিবারটির জীবন পরিবর্তন হতে পারে। ঝুপড়ি মেরামত বা স্থায়ী ঘর দেওয়া যেতে পারে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন, “ওনারা ভূমিহীন, এটা মাত্র জানতে পারলাম। যদি তারা আবেদন করেন, আমরা যাচাই করে টিন বা ঘর দেয়ার চেষ্টা করব।”


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত