নজর বিডি
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৫

চিংড়ি ঘেরে নতুন স্বপ্ন: মাছ চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ডুমুরিয়ার নারীরা

চিংড়ি ঘেরে নতুন স্বপ্ন: মাছ চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ডুমুরিয়ার নারীরা

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গোনালী, সাজিয়াড়া, মাগুরাঘোনা, রুদাঘরা ও শোভনা গ্রামের প্রান্তিক নারীরা এখন মৎস্য বিভাগের সহায়তায় নতুন স্বপ্ন দেখছেন — স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন। এক সময় যারা সম্পূর্ণভাবে স্বামীর আয়ে নির্ভর করতেন, আজ তারা নিজেরাই ঘেরে মাছ চাষ করে সংসার চালাচ্ছেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন এবং পরিবারে আর্থিকভাবে সহায়তা দিচ্ছেন।

গোনালী গ্রামের সাবিনা বেগম বলেন,

“আগে আমার স্বামীর টাকার ওপরই নির্ভর করতে হতো, প্রতিটি পয়সা খরচের হিসাব দিতে হতো। যখন উপার্জনের সুযোগ পেলাম, চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি। এখন নিজের আয়ে চলি, সঞ্চয়ও করতে পারি।”

সাবিনা ডুমুরিয়ায় মৎস্য বিভাগের কোস্টাল প্রকল্প থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিজের ঘেরে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। তার স্বামী এখন আর সাগরে মাছ ধরতে যান না; কখনও ঘেরে কাজ করেন, কখনও ভ্যান চালান।

আরাজি সাজিয়াড়ার সোনিয়া বেগমও একইভাবে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন,

“আগে আমাদের পুরুষরা নদীতে যেত, এখন আমরা নিজেরা ঘেরে কাজ করছি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছি।”

মাগুরাঘোনা গ্রামের খাদিজা বেগম, বাগদা-গলদা সিবিও (কমিউনিটি বেইজড অর্গানাইজেশন)-এর সহ-সভাপতি, জানান,

“আমাদের এলাকায় এক হাজারেরও বেশি চিংড়ি ঘের আছে। কিন্তু মৎস্য অফিসের উৎসাহে আমরা প্রথমবার ১৫ জন মহিলা ও ১০ জন পুরুষ মিলে একটি ঘের তৈরি করেছি। আধুনিক চাষ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং নেতৃত্ব বিকাশ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছি। আশা করছি, আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারব।”

রুদাঘরা গলদা-বাগদা সিবিও-এর সভাপতি মুক্তা বিশ্বাস বলেন,

“উপজেলা মৎস্য অফিসের সহায়তায় আমাদের প্রকল্প ভালোভাবে এগিয়ে চলছে। সব লেনদেন আমরা ব্যাংকের মাধ্যমে করি। এই সমিতির মাধ্যমে এলাকার মহিলারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি ২৫ সদস্যের মৎস্যচাষি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং মৎস্য অফিসের সহায়তায় ফিলিপাইন গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগও পেয়েছেন।

শোভনা বাগদা সিবিও-এর কোষাধ্যক্ষ খাদিজা বেগম বলেন,

“আমরা ১৩ জন মহিলা ও ১২ জন পুরুষ মিলে শোভনা পশ্চিমপাড়ায় একটি ঘের লিজ নিয়েছি। সরকারি সহায়তায় এই প্রথম এমন প্রকল্প আমাদের এলাকায় এসেছে। অফিস থেকে হাতে-কলমে চিংড়ি চাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছি।”

তিনি যোগ করেন,

“প্রকল্পের আওতায় আমরা সাইনবোর্ড, নেট, চুন, পালিশ কুড়া, ইস্ট, সার, খৈল, মাছ ও চিংড়ির পিএল এবং খাবারও পেয়েছি। এই সহায়তা পেয়ে আমরা এখন আত্মবিশ্বাসী। আশা করছি, নিজেদের ঘাম ও পরিশ্রমে জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারব।”

ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন,

“মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প’ ও ‘কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় আমরা প্রান্তিক নারী ও জেলে সম্প্রদায়ের নারীদের প্রশিক্ষণ, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করাই মূল লক্ষ্য।”

তিনি জানান, ইতিমধ্যে ডুমুরিয়ার বহু নারী মাছ চাষে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন।

এই উদ্যোগ শুধু নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে না, বরং পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থানও দৃঢ় করছে। এক সময় যারা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তারা আজ নিজের ঘেরের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যতের গল্প লিখছেন — আত্মনির্ভরশীল এক প্রজন্মের গল্প।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


চিংড়ি ঘেরে নতুন স্বপ্ন: মাছ চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ডুমুরিয়ার নারীরা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫

featured Image

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গোনালী, সাজিয়াড়া, মাগুরাঘোনা, রুদাঘরা ও শোভনা গ্রামের প্রান্তিক নারীরা এখন মৎস্য বিভাগের সহায়তায় নতুন স্বপ্ন দেখছেন — স্বাবলম্বী জীবনের স্বপ্ন। এক সময় যারা সম্পূর্ণভাবে স্বামীর আয়ে নির্ভর করতেন, আজ তারা নিজেরাই ঘেরে মাছ চাষ করে সংসার চালাচ্ছেন, সন্তানদের পড়াশোনা করাচ্ছেন এবং পরিবারে আর্থিকভাবে সহায়তা দিচ্ছেন।

গোনালী গ্রামের সাবিনা বেগম বলেন,

“আগে আমার স্বামীর টাকার ওপরই নির্ভর করতে হতো, প্রতিটি পয়সা খরচের হিসাব দিতে হতো। যখন উপার্জনের সুযোগ পেলাম, চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি। এখন নিজের আয়ে চলি, সঞ্চয়ও করতে পারি।”

সাবিনা ডুমুরিয়ায় মৎস্য বিভাগের কোস্টাল প্রকল্প থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিজের ঘেরে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। তার স্বামী এখন আর সাগরে মাছ ধরতে যান না; কখনও ঘেরে কাজ করেন, কখনও ভ্যান চালান।

আরাজি সাজিয়াড়ার সোনিয়া বেগমও একইভাবে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন,

“আগে আমাদের পুরুষরা নদীতে যেত, এখন আমরা নিজেরা ঘেরে কাজ করছি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছি।”

মাগুরাঘোনা গ্রামের খাদিজা বেগম, বাগদা-গলদা সিবিও (কমিউনিটি বেইজড অর্গানাইজেশন)-এর সহ-সভাপতি, জানান,

“আমাদের এলাকায় এক হাজারেরও বেশি চিংড়ি ঘের আছে। কিন্তু মৎস্য অফিসের উৎসাহে আমরা প্রথমবার ১৫ জন মহিলা ও ১০ জন পুরুষ মিলে একটি ঘের তৈরি করেছি। আধুনিক চাষ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং নেতৃত্ব বিকাশ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছি। আশা করছি, আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারব।”

রুদাঘরা গলদা-বাগদা সিবিও-এর সভাপতি মুক্তা বিশ্বাস বলেন,

“উপজেলা মৎস্য অফিসের সহায়তায় আমাদের প্রকল্প ভালোভাবে এগিয়ে চলছে। সব লেনদেন আমরা ব্যাংকের মাধ্যমে করি। এই সমিতির মাধ্যমে এলাকার মহিলারা নতুন স্বপ্ন নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

তিনি আরও জানান, বর্তমানে তিনি ২৫ সদস্যের মৎস্যচাষি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং মৎস্য অফিসের সহায়তায় ফিলিপাইন গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগও পেয়েছেন।

শোভনা বাগদা সিবিও-এর কোষাধ্যক্ষ খাদিজা বেগম বলেন,

“আমরা ১৩ জন মহিলা ও ১২ জন পুরুষ মিলে শোভনা পশ্চিমপাড়ায় একটি ঘের লিজ নিয়েছি। সরকারি সহায়তায় এই প্রথম এমন প্রকল্প আমাদের এলাকায় এসেছে। অফিস থেকে হাতে-কলমে চিংড়ি চাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছি।”

তিনি যোগ করেন,

“প্রকল্পের আওতায় আমরা সাইনবোর্ড, নেট, চুন, পালিশ কুড়া, ইস্ট, সার, খৈল, মাছ ও চিংড়ির পিএল এবং খাবারও পেয়েছি। এই সহায়তা পেয়ে আমরা এখন আত্মবিশ্বাসী। আশা করছি, নিজেদের ঘাম ও পরিশ্রমে জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারব।”

ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন,

“মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প’ ও ‘কমিউনিটি বেইজড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় আমরা প্রান্তিক নারী ও জেলে সম্প্রদায়ের নারীদের প্রশিক্ষণ, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করাই মূল লক্ষ্য।”

তিনি জানান, ইতিমধ্যে ডুমুরিয়ার বহু নারী মাছ চাষে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন।

এই উদ্যোগ শুধু নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে না, বরং পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থানও দৃঢ় করছে। এক সময় যারা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তারা আজ নিজের ঘেরের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যতের গল্প লিখছেন — আত্মনির্ভরশীল এক প্রজন্মের গল্প।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত