নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫

জয়পুরহাটে সার বিতরণে ত্রিমুখী খেলা

জয়পুরহাটে সার বিতরণে ত্রিমুখী খেলা
চাহিদার চেয়ে জোগান কম, দুষছে কৃষক-ডিলার-প্রশাসন সবাইকে...   মোস্তাফিজুর রহমান , জয়পুরহাট: উত্তরের কৃষিভান্ডার খ্যাত জয়পুরহাটে আমন মৌসুমের শেষ ও আগাম রবি মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে আবারও দেখা দিয়েছে সার সংকট। কৃষকেরা বলছেন—চাহিদা অনুযায়ী ডিলারের কাছে গিয়ে সার মিলছে না। অথচ ডিলারের দাবি—তাদের কাছে বরাদ্দকৃত পরিমাণের বাইরে অতিরিক্ত সার দেওয়ার সুযোগ নেই। আর কৃষি বিভাগ বলছে—কৃষকেরা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছেন বিধায় সংকট তৈরি হচ্ছে। এ যেন সার বিতরণে ত্রিমুখী দায় চাপানোর খেলা। কৃষকেরা বলছেন বিগত বছরে আলুর ফলন ভালো হলেও কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য কিছু কৃষক আগাম আলু লাগিয়েছিল কিন্তু সেটিও কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে ধুলিস্যাৎ। এ অবস্থায় সকল ক্ষতিকে মেনে নিয়ে এবারে আলু চাষে কৃষক জমি প্রস্তুত করলেও চাহিদা মত সার না পাওয়া চিন্তার ভাঁজ কৃষকের কপালে। সরে জমিনে জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে সার সংকটের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের পেঁচুলিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম ও মোমেজ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, জমি প্রস্তুত করে স্যারের জন্য ডিলারের ঘরে গেলে তিনি কৃষি কর্ডে কৃষি কর্মকর্তার সুপারিশ নিয়া আসতে বলেন। এমতাবস্থায় উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সোনালী পাহানকে জানাই। তারপর তিনি আমাদেরকে সার প্রদানের জন্য কৃষি কার্ডে সুপারিশ করে দিলেও ডিলার একই সুরে কথা বলে সার নাই আমার ঘরে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা কর্মকর্তার সুপারিশকৃত কার্ড দেখিয়ে ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ডিলারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তার ঘরে সার না থাকার কথা স্বীকার করেন। আক্কেলপুর উপজেলার রোয়ার গ্রামের কৃষক সোলায়মান আলী বলেন, এবার আমি পাঁচ বিঘা জমিতে আলু ও সরিষা রোপনের উদ্দেশ্যে চাষ করেছি। কিন্তু চাহিদা মতো টিএসপি আর ডিএপি পাচ্ছি না। দোকানে গেলে বলে সরবরাহ নাই। কিন্তু আমরা দেখি গোপনে অনেকেই বেশি নিয়ে যাচ্ছে। সদর উপজেলার পুরনাপৈল ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের ক্ষুব্ধ কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়। বাড়িতে আমার আলু বীজ অতিরিক্ত অঙ্কুরিত (টেক) হওয়ার ফলে লাগানোর অনুপোযোগী হচ্ছে। কিছু আলোবীজে ইতিমধ্যে পচন শুরু হয়েছে। অথচ সবার অগোচরে অনেক সময় অতিরিক্ত দাম দিলে ঠিকই সার মিলে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন জয়পুরহাটের সভাপতি রওনকুল ইসলাম টিপু বলেন,সরকার যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়, সেটি দিয়েই আমাদের চলতে হয়। কৃষকের চাহিদা বেড়ে গেলেও আমাদের হাতে তো অতিরিক্ত সার থাকে না। এমনকি এলাকা ভিত্তিক বরাদ্দকৃত এক ওয়ার্ডের সার অন্য ওয়ার্ডের কৃষককে দিতে পারি না। কৃষকের জমির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে বরাদ্দকৃত পরিমাণ সার বিতরণ করছি। জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ এ.কে.এম. সাদিকুল ইসলাম জানান,অনেক কৃষক নির্ধারিত জমির তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ সার চাইছেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। অতিরিক্ত সার প্রয়োগে সাময়িকভাবে ফসল উৎপাদন ভালো হলেও কয়েক বছর পর ওই জমিগুলো পূর্ণমাত্রায় তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলবে। কিছু কৃষক না বুঝেই জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছে। তবে এ বিষয়ে আমরা কৃষকদের মাঝে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। স্থানীয় এক কৃষি গবেষক নুরুজ্জামান সরকার বলেন, সারের চাহিদা, সরবরাহ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সংকট তৈরি হচ্ছে । এর স্থায়ী সমাধানে ডিজিটাল বিতরণ ব্যবস্থা ও কঠোর মনিটরিং জরুরি। জয়পুরহাটে সারের এ অনিয়ম কৃষকদের চাষাবাদে যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি কৃষিপণ্য উৎপাদনে হুমকিও তৈরি করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে আগামী মৌসুমে সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে—এমনটাই আশঙ্কা করছেন এই কৃষি গবেষক।    

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


জয়পুরহাটে সার বিতরণে ত্রিমুখী খেলা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫

featured Image
চাহিদার চেয়ে জোগান কম, দুষছে কৃষক-ডিলার-প্রশাসন সবাইকে...   মোস্তাফিজুর রহমান , জয়পুরহাট: উত্তরের কৃষিভান্ডার খ্যাত জয়পুরহাটে আমন মৌসুমের শেষ ও আগাম রবি মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে আবারও দেখা দিয়েছে সার সংকট। কৃষকেরা বলছেন—চাহিদা অনুযায়ী ডিলারের কাছে গিয়ে সার মিলছে না। অথচ ডিলারের দাবি—তাদের কাছে বরাদ্দকৃত পরিমাণের বাইরে অতিরিক্ত সার দেওয়ার সুযোগ নেই। আর কৃষি বিভাগ বলছে—কৃষকেরা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছেন বিধায় সংকট তৈরি হচ্ছে। এ যেন সার বিতরণে ত্রিমুখী দায় চাপানোর খেলা। কৃষকেরা বলছেন বিগত বছরে আলুর ফলন ভালো হলেও কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য কিছু কৃষক আগাম আলু লাগিয়েছিল কিন্তু সেটিও কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে ধুলিস্যাৎ। এ অবস্থায় সকল ক্ষতিকে মেনে নিয়ে এবারে আলু চাষে কৃষক জমি প্রস্তুত করলেও চাহিদা মত সার না পাওয়া চিন্তার ভাঁজ কৃষকের কপালে। সরে জমিনে জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে সার সংকটের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের পেঁচুলিয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম ও মোমেজ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, জমি প্রস্তুত করে স্যারের জন্য ডিলারের ঘরে গেলে তিনি কৃষি কর্ডে কৃষি কর্মকর্তার সুপারিশ নিয়া আসতে বলেন। এমতাবস্থায় উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সোনালী পাহানকে জানাই। তারপর তিনি আমাদেরকে সার প্রদানের জন্য কৃষি কার্ডে সুপারিশ করে দিলেও ডিলার একই সুরে কথা বলে সার নাই আমার ঘরে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা কর্মকর্তার সুপারিশকৃত কার্ড দেখিয়ে ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ডিলারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তার ঘরে সার না থাকার কথা স্বীকার করেন। আক্কেলপুর উপজেলার রোয়ার গ্রামের কৃষক সোলায়মান আলী বলেন, এবার আমি পাঁচ বিঘা জমিতে আলু ও সরিষা রোপনের উদ্দেশ্যে চাষ করেছি। কিন্তু চাহিদা মতো টিএসপি আর ডিএপি পাচ্ছি না। দোকানে গেলে বলে সরবরাহ নাই। কিন্তু আমরা দেখি গোপনে অনেকেই বেশি নিয়ে যাচ্ছে। সদর উপজেলার পুরনাপৈল ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের ক্ষুব্ধ কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়। বাড়িতে আমার আলু বীজ অতিরিক্ত অঙ্কুরিত (টেক) হওয়ার ফলে লাগানোর অনুপোযোগী হচ্ছে। কিছু আলোবীজে ইতিমধ্যে পচন শুরু হয়েছে। অথচ সবার অগোচরে অনেক সময় অতিরিক্ত দাম দিলে ঠিকই সার মিলে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন জয়পুরহাটের সভাপতি রওনকুল ইসলাম টিপু বলেন,সরকার যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়, সেটি দিয়েই আমাদের চলতে হয়। কৃষকের চাহিদা বেড়ে গেলেও আমাদের হাতে তো অতিরিক্ত সার থাকে না। এমনকি এলাকা ভিত্তিক বরাদ্দকৃত এক ওয়ার্ডের সার অন্য ওয়ার্ডের কৃষককে দিতে পারি না। কৃষকের জমির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে বরাদ্দকৃত পরিমাণ সার বিতরণ করছি। জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ এ.কে.এম. সাদিকুল ইসলাম জানান,অনেক কৃষক নির্ধারিত জমির তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ সার চাইছেন, যা বাস্তবসম্মত নয়। অতিরিক্ত সার প্রয়োগে সাময়িকভাবে ফসল উৎপাদন ভালো হলেও কয়েক বছর পর ওই জমিগুলো পূর্ণমাত্রায় তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলবে। কিছু কৃষক না বুঝেই জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছে। তবে এ বিষয়ে আমরা কৃষকদের মাঝে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। স্থানীয় এক কৃষি গবেষক নুরুজ্জামান সরকার বলেন, সারের চাহিদা, সরবরাহ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় সংকট তৈরি হচ্ছে । এর স্থায়ী সমাধানে ডিজিটাল বিতরণ ব্যবস্থা ও কঠোর মনিটরিং জরুরি। জয়পুরহাটে সারের এ অনিয়ম কৃষকদের চাষাবাদে যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি কৃষিপণ্য উৎপাদনে হুমকিও তৈরি করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে আগামী মৌসুমে সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে—এমনটাই আশঙ্কা করছেন এই কৃষি গবেষক।    

নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত