নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

নতুন বইয়ের আনন্দ ম্লান করছে চরের তীব্র শিক্ষক সংকট: অনিশ্চয়তায় হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

নতুন বইয়ের আনন্দ ম্লান করছে চরের তীব্র শিক্ষক সংকট: অনিশ্চয়তায় হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, নজরবিডি।

নতুন বছর মানেই শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন বইয়ের উচ্ছ্বাস। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই বছরের প্রথম দিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মার চরের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাবে ঝকঝকে নতুন বই। বইয়ের গন্ধে মুখর হবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

তবে এই উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে দীর্ঘদিনের তীব্র শিক্ষক সংকট চরের শিশুদের শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের পদ্মার চরের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৫০টি। অথচ বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৫ জন। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে ৬০ শতাংশের বেশি বা ৬৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চলে নতুন শিক্ষক নিয়োগ পেলেও যাতায়াত ও আবাসন সমস্যার অজুহাতে অনেকেই সেখানে থাকতে চান না। অল্প সময়ের মধ্যেই নানা তদবিরে তারা সুবিধাজনক এলাকায় বদলি হয়ে যান। চরাঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখার জন্য কার্যকর কোনো নীতিমালা বা বিশেষ প্রণোদনা না থাকায় এই সংকট বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণির বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ২-৩ জন। কোথাও আবার একজন শিক্ষককেই সামলাতে হচ্ছে পুরো বিদ্যালয়। এতে করে মানসম্মত পাঠদান কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চিলমারী ইউনিয়নের খারিজাথাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের প্রায়ই দাপ্তরিক কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যেতে হয়। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াতেই পুরো দিন শেষ হয়ে যায়। ফলে ওই দিনগুলোতে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যত বন্ধ থাকে।

চরাঞ্চল থেকে উপজেলা সদরে যাতায়াতে একজন শিক্ষকের গড়ে ৪ ঘণ্টা সময় ও ২০০-৩০০ টাকা খরচ হয়। বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা, যা নারী শিক্ষকদের জন্য চরম কষ্টসাধ্য।

পূর্ব খারিজাথাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারভিনা আক্তার ১৮ বছর ধরে চরাঞ্চলে শিক্ষকতা করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আমার বিদ্যালয়ে ৩৬৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র তিনজন। প্রতিটি শ্রেণিতে গড়ে ৬০-৬৫ জন শিক্ষার্থী। আমি দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকলে মাত্র দুইজন দিয়ে পুরো স্কুল চালানো অসম্ভব।"

সোনাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় ক্লাস হয় না। কখনও কখনও অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের বসিয়ে রাখা হয়।

অভিভাবক আব্দুর রাজ্জাক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সন্তানের হাতে নতুন বই আছে, কিন্তু মাথার ওপর শিক্ষক নেই। চরের শিশুরা কি তবে অবহেলিত? শহরের শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলেও আমাদের এখানে কেন নেই?"

শিক্ষক সংকটের কারণে চরের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। অনেকেই প্রাথমিক শেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ছে।

দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুস্তাক আহম্মেদ বলেন, "নতুন শিক্ষকরা চরাঞ্চলে থাকতে চান না। জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা রয়েছে। আমরা চাহিদা পাঠিয়েছি, আশা করছি তখন সংকট কিছুটা কাটবে।"

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন শিক্ষক আসার আগেই অনেকে বদলির আবেদন করে রেখেছেন। ফলে নতুন নিয়োগে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

শুধু চরাঞ্চল নয়, পুরো দৌলতপুর উপজেলায় ২১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। ১ হাজার ১৬৬টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ১৩২টি পদ শূন্য। নতুন বইয়ের আনন্দের মাঝে শিক্ষক সংকটের এই দীর্ঘশ্বাস পদ্মার চরের হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


নতুন বইয়ের আনন্দ ম্লান করছে চরের তীব্র শিক্ষক সংকট: অনিশ্চয়তায় হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, নজরবিডি।

নতুন বছর মানেই শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন বইয়ের উচ্ছ্বাস। আর মাত্র কয়েক দিন পরেই বছরের প্রথম দিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মার চরের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাবে ঝকঝকে নতুন বই। বইয়ের গন্ধে মুখর হবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

তবে এই উৎসবের আমেজ ছাপিয়ে দীর্ঘদিনের তীব্র শিক্ষক সংকট চরের শিশুদের শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের পদ্মার চরের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৫০টি। অথচ বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৫ জন। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে ৬০ শতাংশের বেশি বা ৬৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম চরাঞ্চলে নতুন শিক্ষক নিয়োগ পেলেও যাতায়াত ও আবাসন সমস্যার অজুহাতে অনেকেই সেখানে থাকতে চান না। অল্প সময়ের মধ্যেই নানা তদবিরে তারা সুবিধাজনক এলাকায় বদলি হয়ে যান। চরাঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখার জন্য কার্যকর কোনো নীতিমালা বা বিশেষ প্রণোদনা না থাকায় এই সংকট বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণির বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ২-৩ জন। কোথাও আবার একজন শিক্ষককেই সামলাতে হচ্ছে পুরো বিদ্যালয়। এতে করে মানসম্মত পাঠদান কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চিলমারী ইউনিয়নের খারিজাথাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের প্রায়ই দাপ্তরিক কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যেতে হয়। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াতেই পুরো দিন শেষ হয়ে যায়। ফলে ওই দিনগুলোতে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যত বন্ধ থাকে।

চরাঞ্চল থেকে উপজেলা সদরে যাতায়াতে একজন শিক্ষকের গড়ে ৪ ঘণ্টা সময় ও ২০০-৩০০ টাকা খরচ হয়। বর্ষায় নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা, যা নারী শিক্ষকদের জন্য চরম কষ্টসাধ্য।

পূর্ব খারিজাথাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারভিনা আক্তার ১৮ বছর ধরে চরাঞ্চলে শিক্ষকতা করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "আমার বিদ্যালয়ে ৩৬৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র তিনজন। প্রতিটি শ্রেণিতে গড়ে ৬০-৬৫ জন শিক্ষার্থী। আমি দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকলে মাত্র দুইজন দিয়ে পুরো স্কুল চালানো অসম্ভব।"

সোনাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় ক্লাস হয় না। কখনও কখনও অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের বসিয়ে রাখা হয়।

অভিভাবক আব্দুর রাজ্জাক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সন্তানের হাতে নতুন বই আছে, কিন্তু মাথার ওপর শিক্ষক নেই। চরের শিশুরা কি তবে অবহেলিত? শহরের শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলেও আমাদের এখানে কেন নেই?"

শিক্ষক সংকটের কারণে চরের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। অনেকেই প্রাথমিক শেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ছে।

দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুস্তাক আহম্মেদ বলেন, "নতুন শিক্ষকরা চরাঞ্চলে থাকতে চান না। জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা রয়েছে। আমরা চাহিদা পাঠিয়েছি, আশা করছি তখন সংকট কিছুটা কাটবে।"

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন শিক্ষক আসার আগেই অনেকে বদলির আবেদন করে রেখেছেন। ফলে নতুন নিয়োগে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

শুধু চরাঞ্চল নয়, পুরো দৌলতপুর উপজেলায় ২১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। ১ হাজার ১৬৬টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ১৩২টি পদ শূন্য। নতুন বইয়ের আনন্দের মাঝে শিক্ষক সংকটের এই দীর্ঘশ্বাস পদ্মার চরের হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত