নজর বিডি

শতবর্ষের রসনা বিলাস: চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিচ্ছে মতলবের ‘ক্ষীর’

শতবর্ষের রসনা বিলাস: চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিচ্ছে মতলবের ‘ক্ষীর’
বাঙালির শেষ পাতে মিষ্টান্ন মানেই এক অনন্য তৃপ্তি। আর এই রসনা বিলাসে গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করে চলেছে চাঁদপুর জেলার মতলবের ঐতিহ্যবাহী ‘ক্ষীর’। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক উপঢৌকন—সবখানেই মতলবের ক্ষীর এখন আভিজাত্যের প্রতীক। এমনকি চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিয়ে এই ক্ষীর পৌঁছে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে সহ দেশের বাইরে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য— মতলব উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত ‘মতলবের ইতিবৃত্ত’ এবং জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও এই ক্ষীরের সুখ্যাতি বয়ান করা হয়েছে। একসময় মতলবের ঘোষপাড়া ছিল ক্ষীর, দধি ও ঘি তৈরির প্রধান কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলে এখানকার জমিদার ও ইংরেজদের কাছে এই ক্ষীর ছিল অত্যন্ত প্রিয়। তৎকালীন সময়ে গান্ধীচরণ ঘোষ, বেনু ঘোষ, হরিপদ ঘোষ ও প্রভাত ঘোষের মতো কারিগররা মণে মণে ক্ষীর তৈরি করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাতেন। বর্তমানে গান্ধীচরণের সুযোগ্য সন্তান সজল ঘোষসহ আরও কয়েকটি পরিবার এই আদি পেশাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। নন্দকেবিনের মালিক বাসু ঘোষ ক্ষীরের সেরা হওয়ার পাঁচটি প্রধান রহস্য উন্মোচন করেছেন— ১. সম্পূর্ণ গৃহস্থের কাছ থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ। ২. দুধের ননি না উঠিয়েই ক্ষীর প্রস্তুত করা। ৩. এক কেজি ক্ষীর বানাতে প্রায় পাঁচ কেজি দুধ ব্যবহার। ৪. কোনো প্রকার ময়দা বা আটা না মেশানো। ৫. আধুনিক চুলার পরিবর্তে লাকড়ির চুলায় দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়া। বর্তমানে এক কেজি ভালো মানের ক্ষীর তৈরিতে খরচ ও দুধের দাম বাড়ায় এর বাজারমূল্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। আনন্দ ক্ষীর-ঘরের মালিক উৎপল ঘোষ জানান, দুপুরে বড় পাত্রে দুই ঘণ্টা দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর তৈরি করা হয় এবং পরে তা মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন শুধু দোকানে নয়, ই-কমার্স ও অনলাইনের মাধ্যমেও এই ক্ষীর পৌঁছে যাচ্ছে সারা দেশে। মতলবের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন নিয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা হক বলেন—মতলবের ক্ষীর আমাদের এলাকার একটি গৌরবময় ঐতিহ্য। এটি শুধুমাত্র একটি খাবার নয়, বরং আমাদের মতলবের ব্রান্ডিং। উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত ‘মতলবের ইতিবৃত্ত’ বইয়েও এই ক্ষীরের ঐতিহ্যের কথা সগৌরবে উল্লেখ আছে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন শিল্পটি আরও প্রসারিত হোক। এর বিশুদ্ধতা ও মান বজায় রাখতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদারকি ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় শিক্ষিকা নাসরিন জাহান নীপা বলেন—আমাদের ক্ষীরের কদর দেশব্যাপী। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, তাই কোনোভাবেই যেন এর মান পড়ে না যায়, সেদিকে প্রস্তুতকারকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি। শত বছরের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মতলবের ক্ষীর আজও টিকে আছে তার আপন মহিমায়। কাঁচামালের দাম বাড়লেও স্বাদে ও গুণে আপসহীন এই মিষ্টান্নটি চাঁদপুরের গৌরব হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


শতবর্ষের রসনা বিলাস: চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিচ্ছে মতলবের ‘ক্ষীর’

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image
বাঙালির শেষ পাতে মিষ্টান্ন মানেই এক অনন্য তৃপ্তি। আর এই রসনা বিলাসে গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করে চলেছে চাঁদপুর জেলার মতলবের ঐতিহ্যবাহী ‘ক্ষীর’। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এর আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক উপঢৌকন—সবখানেই মতলবের ক্ষীর এখন আভিজাত্যের প্রতীক। এমনকি চাঁদপুরের ইলিশের সাথে পাল্লা দিয়ে এই ক্ষীর পৌঁছে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে সহ দেশের বাইরে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য— মতলব উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত ‘মতলবের ইতিবৃত্ত’ এবং জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও এই ক্ষীরের সুখ্যাতি বয়ান করা হয়েছে। একসময় মতলবের ঘোষপাড়া ছিল ক্ষীর, দধি ও ঘি তৈরির প্রধান কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলে এখানকার জমিদার ও ইংরেজদের কাছে এই ক্ষীর ছিল অত্যন্ত প্রিয়। তৎকালীন সময়ে গান্ধীচরণ ঘোষ, বেনু ঘোষ, হরিপদ ঘোষ ও প্রভাত ঘোষের মতো কারিগররা মণে মণে ক্ষীর তৈরি করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাতেন। বর্তমানে গান্ধীচরণের সুযোগ্য সন্তান সজল ঘোষসহ আরও কয়েকটি পরিবার এই আদি পেশাটি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। নন্দকেবিনের মালিক বাসু ঘোষ ক্ষীরের সেরা হওয়ার পাঁচটি প্রধান রহস্য উন্মোচন করেছেন— ১. সম্পূর্ণ গৃহস্থের কাছ থেকে সংগ্রহ করা খাঁটি দুধ। ২. দুধের ননি না উঠিয়েই ক্ষীর প্রস্তুত করা। ৩. এক কেজি ক্ষীর বানাতে প্রায় পাঁচ কেজি দুধ ব্যবহার। ৪. কোনো প্রকার ময়দা বা আটা না মেশানো। ৫. আধুনিক চুলার পরিবর্তে লাকড়ির চুলায় দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়া। বর্তমানে এক কেজি ভালো মানের ক্ষীর তৈরিতে খরচ ও দুধের দাম বাড়ায় এর বাজারমূল্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। আনন্দ ক্ষীর-ঘরের মালিক উৎপল ঘোষ জানান, দুপুরে বড় পাত্রে দুই ঘণ্টা দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর তৈরি করা হয় এবং পরে তা মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন শুধু দোকানে নয়, ই-কমার্স ও অনলাইনের মাধ্যমেও এই ক্ষীর পৌঁছে যাচ্ছে সারা দেশে। মতলবের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন নিয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহমিদা হক বলেন—মতলবের ক্ষীর আমাদের এলাকার একটি গৌরবময় ঐতিহ্য। এটি শুধুমাত্র একটি খাবার নয়, বরং আমাদের মতলবের ব্রান্ডিং। উপজেলা প্রশাসন সম্পাদিত ‘মতলবের ইতিবৃত্ত’ বইয়েও এই ক্ষীরের ঐতিহ্যের কথা সগৌরবে উল্লেখ আছে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন শিল্পটি আরও প্রসারিত হোক। এর বিশুদ্ধতা ও মান বজায় রাখতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদারকি ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় শিক্ষিকা নাসরিন জাহান নীপা বলেন—আমাদের ক্ষীরের কদর দেশব্যাপী। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, তাই কোনোভাবেই যেন এর মান পড়ে না যায়, সেদিকে প্রস্তুতকারকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি। শত বছরের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মতলবের ক্ষীর আজও টিকে আছে তার আপন মহিমায়। কাঁচামালের দাম বাড়লেও স্বাদে ও গুণে আপসহীন এই মিষ্টান্নটি চাঁদপুরের গৌরব হিসেবে যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত