উপকূলের ‘মহৌষধ’ ও অর্থকরী সম্ভাবনা, সুন্দরবনের কেওড়া ফলের যত গুণ।
বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের খাল ও নদীর পাড়ে তাকালেই চোখে পড়ে থোকা থোকা সবুজ রঙের ফল। গোলাকার ডুমুরের মতো দেখতে এ ফলটির নাম কেওড়া। বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala। সুন্দরবনের হরিণ ও বানরের অন্যতম প্রিয় খাবার কেওড়া শুধু বন্যপ্রাণীর খাদ্যই নয়, উপকূলীয় মানুষের জন্যও এটি পুষ্টিকর, ঔষধিগুণসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময় একটি প্রাকৃতিক সম্পদ।
বাওয়ালি থেকে গবেষকের চোখে কেওড়া
কেওড়া ফলের স্বাদ, ব্যবহার ও স্বাস্থ্যগত নানা দিক জানতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বনজীবী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন আড়পাংশিয়া এলাকার বনজীবী রহিম শেখ বলেন, “ফাল্গুন মাসে কেওড়া গাছে ফুল আসে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বন থেকে আমরা পাকা কেওড়া সংগ্রহ করি। এ সময় বনে হরিণ ও বানরের কেওড়া খাওয়ার ধুম পড়ে যায়।”
তিনি জানান, স্থানীয়রা কাঁচা কেওড়া দিয়ে ছোট চিংড়ি মাছ রান্না করেন। এছাড়া মসুর ডালে টক হিসেবে ব্যবহার, চাটনি ও আচার তৈরিতেও কেওড়া ফল ব্যবহৃত হয়। গরমের সময় কেওড়ার টক খেলে শরীর সতেজ হয় এবং হজমের সমস্যায়ও উপকার পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের ধারণা।
পুষ্টি ও ঔষধিগুণ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, কেওড়া ফলে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
তিনি বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ আপেল বা কমলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এতে প্রায় ১২ শতাংশ শর্করা, ৪ শতাংশ আমিষ এবং প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে আমলকীর পর কেওড়া ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পলিফেনল পাওয়া যায়।”
ড. জুলফিকার হোসেন আরও বলেন, কেওড়া ফলে থাকা বিভিন্ন উপাদানের কারণে এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশকসহ নানা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে। এতে আয়রন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদানও পাওয়া যায়।
তবে কেওড়া ফল কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়; এর ঔষধিগুণ ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকারিতা নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ কেওড়া
সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেওড়া গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি একটি অগ্রগামী বৃক্ষ (Pioneer Plant)। নতুন জেগে ওঠা চর ও লবণাক্ত এলাকায় অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় কেওড়া দ্রুত জন্মাতে পারে।
জোয়ার-ভাটার প্রভাব ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে গড়ে ওঠা কেওড়ার বন মাটির ক্ষয় রোধে সহায়তা করে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবেও কাজ করে।
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া ফলের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানোর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কেওড়া দিয়ে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা গেলে সুন্দরবনসংলগ্ন প্রান্তিক মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে কেওড়া ফল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতের ব্যবস্থা করা গেলে দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এসব পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
সুন্দরবনের কেওড়া তাই শুধু হরিণ-বানরের প্রিয় খাদ্য নয়; পুষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও এটি উপকূলের এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
উপকূলের ‘মহৌষধ’ ও অর্থকরী সম্ভাবনা, সুন্দরবনের কেওড়া ফলের যত গুণ।
বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের খাল ও নদীর পাড়ে তাকালেই চোখে পড়ে থোকা থোকা সবুজ রঙের ফল। গোলাকার ডুমুরের মতো দেখতে এ ফলটির নাম কেওড়া। বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala। সুন্দরবনের হরিণ ও বানরের অন্যতম প্রিয় খাবার কেওড়া শুধু বন্যপ্রাণীর খাদ্যই নয়, উপকূলীয় মানুষের জন্যও এটি পুষ্টিকর, ঔষধিগুণসম্পন্ন ও সম্ভাবনাময় একটি প্রাকৃতিক সম্পদ।
বাওয়ালি থেকে গবেষকের চোখে কেওড়া
কেওড়া ফলের স্বাদ, ব্যবহার ও স্বাস্থ্যগত নানা দিক জানতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বনজীবী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন আড়পাংশিয়া এলাকার বনজীবী রহিম শেখ বলেন, “ফাল্গুন মাসে কেওড়া গাছে ফুল আসে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বন থেকে আমরা পাকা কেওড়া সংগ্রহ করি। এ সময় বনে হরিণ ও বানরের কেওড়া খাওয়ার ধুম পড়ে যায়।”
তিনি জানান, স্থানীয়রা কাঁচা কেওড়া দিয়ে ছোট চিংড়ি মাছ রান্না করেন। এছাড়া মসুর ডালে টক হিসেবে ব্যবহার, চাটনি ও আচার তৈরিতেও কেওড়া ফল ব্যবহৃত হয়। গরমের সময় কেওড়ার টক খেলে শরীর সতেজ হয় এবং হজমের সমস্যায়ও উপকার পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের ধারণা।
পুষ্টি ও ঔষধিগুণ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, কেওড়া ফলে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
তিনি বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ আপেল বা কমলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এতে প্রায় ১২ শতাংশ শর্করা, ৪ শতাংশ আমিষ এবং প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে আমলকীর পর কেওড়া ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পলিফেনল পাওয়া যায়।”
ড. জুলফিকার হোসেন আরও বলেন, কেওড়া ফলে থাকা বিভিন্ন উপাদানের কারণে এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশকসহ নানা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে। এতে আয়রন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদানও পাওয়া যায়।
তবে কেওড়া ফল কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়; এর ঔষধিগুণ ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকারিতা নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ কেওড়া
সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেওড়া গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি একটি অগ্রগামী বৃক্ষ (Pioneer Plant)। নতুন জেগে ওঠা চর ও লবণাক্ত এলাকায় অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় কেওড়া দ্রুত জন্মাতে পারে।
জোয়ার-ভাটার প্রভাব ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে গড়ে ওঠা কেওড়ার বন মাটির ক্ষয় রোধে সহায়তা করে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবেও কাজ করে।
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া ফলের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানোর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কেওড়া দিয়ে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা গেলে সুন্দরবনসংলগ্ন প্রান্তিক মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে কেওড়া ফল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতের ব্যবস্থা করা গেলে দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এসব পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
সুন্দরবনের কেওড়া তাই শুধু হরিণ-বানরের প্রিয় খাদ্য নয়; পুষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও এটি উপকূলের এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ।

আপনার মতামত লিখুন