নজর বিডি

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

আছিয়া থেকে রামিসা: বিচারহীনতার রাজনীতি আর কতদিন?

আছিয়া থেকে রামিসা: বিচারহীনতার রাজনীতি আর কতদিন?
ড. আসিফ মিজান

প্রবন্ধটি মূলত একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা এবং আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আছিয়া বা রামিসার মতো অবোধ শিশুদের ক্ষতবিক্ষত শরীর ও করুণ মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় কাগজে-কলমে কঠোর আইন, বিশেষায়িত আদালত এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা কেবলই এক "নিষ্ঠুর তামাশা"।

অপরাধ দমনের মূল শর্ত ছিল শাস্তির 'নিশ্চয়তা', কিন্তু বর্তমান বিচার ব্যবস্থায় তা কেবলই এক দূরবর্তী 'সম্ভাবনা' হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের স্পর্ধাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া আজ বিকল।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, শিশুরা আজ শুধু বাইরে নয়, বরং তাদের অতি চেনা ও বিশ্বস্ত পরিসরে—যেমন পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও চরম অনিরাপদ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পচনশীল সামাজ অবক্ষয়ের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিভিল প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে যেভাবে দলীয়করণ ও আস্থাহীন করা হয়েছে, তার ফলেই এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। জবাবদিহির অভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারই আজ বলশালীদের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে।

লেখক সমাজের একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন করেছেন—তা হলো আমাদের 'সহজে ভুলে যাওয়ার রোগ'। একটি বীভৎস ঘটনার পর রাজপথ বা সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হলেও, নতুন কোনো ইস্যু এলে আমরা আগেরটি ভুলে যাই। এই সামষ্টিক স্মৃতিভ্রমই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় মিত্র।

বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে ফাঁপা প্রতিশ্রুতি বা শোকবার্তা বন্ধ করে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ৫টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে:

ক্রমিকপ্রস্তাবিত পদক্ষেপমূল লক্ষ্য
ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার কাঠামোগুরুত্বর মামলাগুলো সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকর করা।
জেলা পর্যায়ে আধুনিকায়নপ্রতিটি জেলায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ফরেনসিক ল্যাব ও ভিকটিম-সাপোর্ট ইউনিট গঠন।
বাধ্যতামূলক সেফটি প্রটোকলসকল স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কঠোর সুরক্ষা নীতিমালা ও সিসিটিভি নিশ্চিত করা।
সচেতনতা ও রিপোর্টিং চ্যানেলঅভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা, সহজ হেল্পলাইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ।
সাক্ষী সুরক্ষা আইনমামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া।

"যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্তনাদ শুনেও নড়েচড়ে বসে না, ইতিহাস তাকে কখনোই ক্ষমা করে না।"

আইনের শাসনকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান না বানিয়ে একে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। 

আছিয়া থেকে রামিসার এই রক্তাক্ত তালিকায় যেন আর কোনো নতুন শিশুর নাম যুক্ত না হয়—এই অঙ্গীকারই হোক বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ শিশু নির্যাতন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ড. আসিফ মিজান, আইনি সংস্কার, সামাজিক অবক্ষয়, ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার, কলাম বিশ্লেষণ, মানবাধিকার বাংলাদেশ Child Abuse Bangladesh, Culture of Impunity, Dr. Asif Mizan, Legal Reform, Social Degradation, Fast-track Trial, Human Rights Bangladesh

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


আছিয়া থেকে রামিসা: বিচারহীনতার রাজনীতি আর কতদিন?

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

প্রবন্ধটি মূলত একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা এবং আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতার এক নির্মম দলিল। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আছিয়া বা রামিসার মতো অবোধ শিশুদের ক্ষতবিক্ষত শরীর ও করুণ মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় কাগজে-কলমে কঠোর আইন, বিশেষায়িত আদালত এবং মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা কেবলই এক "নিষ্ঠুর তামাশা"।

অপরাধ দমনের মূল শর্ত ছিল শাস্তির 'নিশ্চয়তা', কিন্তু বর্তমান বিচার ব্যবস্থায় তা কেবলই এক দূরবর্তী 'সম্ভাবনা' হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের স্পর্ধাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া আজ বিকল।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, শিশুরা আজ শুধু বাইরে নয়, বরং তাদের অতি চেনা ও বিশ্বস্ত পরিসরে—যেমন পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও চরম অনিরাপদ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পচনশীল সামাজ অবক্ষয়ের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিভিল প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে যেভাবে দলীয়করণ ও আস্থাহীন করা হয়েছে, তার ফলেই এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। জবাবদিহির অভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারই আজ বলশালীদের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে।

লেখক সমাজের একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন করেছেন—তা হলো আমাদের 'সহজে ভুলে যাওয়ার রোগ'। একটি বীভৎস ঘটনার পর রাজপথ বা সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হলেও, নতুন কোনো ইস্যু এলে আমরা আগেরটি ভুলে যাই। এই সামষ্টিক স্মৃতিভ্রমই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় মিত্র।

বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে ফাঁপা প্রতিশ্রুতি বা শোকবার্তা বন্ধ করে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ৫টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে:

ক্রমিকপ্রস্তাবিত পদক্ষেপমূল লক্ষ্য
ফাস্ট-ট্র্যাক বিচার কাঠামোগুরুত্বর মামলাগুলো সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকর করা।
জেলা পর্যায়ে আধুনিকায়নপ্রতিটি জেলায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ফরেনসিক ল্যাব ও ভিকটিম-সাপোর্ট ইউনিট গঠন।
বাধ্যতামূলক সেফটি প্রটোকলসকল স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কঠোর সুরক্ষা নীতিমালা ও সিসিটিভি নিশ্চিত করা।
সচেতনতা ও রিপোর্টিং চ্যানেলঅভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা, সহজ হেল্পলাইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ।
সাক্ষী সুরক্ষা আইনমামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া।

"যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্তনাদ শুনেও নড়েচড়ে বসে না, ইতিহাস তাকে কখনোই ক্ষমা করে না।"

আইনের শাসনকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান না বানিয়ে একে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। 

আছিয়া থেকে রামিসার এই রক্তাক্ত তালিকায় যেন আর কোনো নতুন শিশুর নাম যুক্ত না হয়—এই অঙ্গীকারই হোক বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত