রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নতুন নতুন সিনথেটিক ও নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ মাদকের (এনপিএস) বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে এখন জম্বি ড্রাগ, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি, এমডিএমএ, ডিওবি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ব্ল্যাক কোকেনসহ অন্তত ১৩ ধরনের নতুন মাদকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব মাদকের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে মাদকের চালান প্রবেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ও আকাশপথও ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ল্যাবরেটরিতে সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের তথ্যও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে এসব মাদক কেনাবেচা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলে মাদক পাঠানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। এতে প্রচলিত মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বড় ঝুঁকি হলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করা। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। মানসিক বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, হতাশা ও আত্মবিধ্বংসী প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
একের পর এক নতুন মাদক শনাক্ত
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে একের পর এক নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক কোকেন’ নামে নতুন মাদক শনাক্ত হয়। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় ডিওবি উদ্ধার করা হয়। আর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস বা ক্রিস্টাল মেথ এবং একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে এলএসডি উদ্ধার করা হয়।
আইস ও ক্রিস্টাল মেথের ভয়াবহতা
আইস বা ক্রিস্টাল মেথ অত্যন্ত শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে তীব্রভাবে উত্তেজিত করে। ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও হ্যালুসিনেশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এলএসডি গ্রহণের পর বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এবং তীব্র হ্যালুসিনেশন ও বিভ্রম তৈরি করতে পারে। এমডিএমএও একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক, যা ইউরোপের বিভিন্ন অবৈধ ল্যাবরেটরিতে উৎপাদনের তথ্য রয়েছে।
এদিকে ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুমও হ্যালুসিনোজেনিক মাদক হিসেবে পরিচিত। ম্যাজিক মাশরুমে থাকা সিলোসাইবিন ও সিলোসিনের প্রভাবে হ্যালুসিনেশন, ভয়, আতঙ্ক, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কারবারিদের কৌশল বদল
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের মতে, সিনথেটিক মাদকের একটি বড় সমস্যা হলো—কোনো কোনো নতুন রাসায়নিক মাদক আইনগতভাবে শিডিউলভুক্ত হওয়ার আগেই বাজারে চলে আসছে। ফলে এসব মাদক শনাক্ত, শ্রেণিবদ্ধ ও আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সময় লাগে।
ডিএনসি'র অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, শুধু ইয়াবা বা গাঁজা নয়, নতুন সিনথেটিক মাদকও তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবির একটি চালান জব্দ করা হয় বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, কোনো সিনথেটিক মাদক জব্দ করা হলে কারবারিরা সেটি ভিন্ন নামে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো মাদক পাওয়া গেলে তা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় এবং সিনথেটিক মাদক হিসেবে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মাদক বেচাকেনা, সেবন ও নির্মূলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মাদক উদ্ধার অভিযান আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে এবং মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সিনথেটিক মাদকের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, নতুন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের জন্যও বড় হুমকি।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নতুন নতুন সিনথেটিক ও নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ মাদকের (এনপিএস) বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে এখন জম্বি ড্রাগ, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি, এমডিএমএ, ডিওবি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ব্ল্যাক কোকেনসহ অন্তত ১৩ ধরনের নতুন মাদকের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব মাদকের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে মাদকের চালান প্রবেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ও আকাশপথও ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ল্যাবরেটরিতে সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের তথ্যও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে এসব মাদক কেনাবেচা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলে মাদক পাঠানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। এতে প্রচলিত মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বড় ঝুঁকি হলো দ্রুত আসক্তি তৈরি করা। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। মানসিক বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, হতাশা ও আত্মবিধ্বংসী প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
একের পর এক নতুন মাদক শনাক্ত
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে একের পর এক নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক কোকেন’ নামে নতুন মাদক শনাক্ত হয়। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় ডিওবি উদ্ধার করা হয়। আর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস বা ক্রিস্টাল মেথ এবং একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে এলএসডি উদ্ধার করা হয়।
আইস ও ক্রিস্টাল মেথের ভয়াবহতা
আইস বা ক্রিস্টাল মেথ অত্যন্ত শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে তীব্রভাবে উত্তেজিত করে। ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও হ্যালুসিনেশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এলএসডি গ্রহণের পর বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এবং তীব্র হ্যালুসিনেশন ও বিভ্রম তৈরি করতে পারে। এমডিএমএও একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক, যা ইউরোপের বিভিন্ন অবৈধ ল্যাবরেটরিতে উৎপাদনের তথ্য রয়েছে।
এদিকে ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুমও হ্যালুসিনোজেনিক মাদক হিসেবে পরিচিত। ম্যাজিক মাশরুমে থাকা সিলোসাইবিন ও সিলোসিনের প্রভাবে হ্যালুসিনেশন, ভয়, আতঙ্ক, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কারবারিদের কৌশল বদল
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের মতে, সিনথেটিক মাদকের একটি বড় সমস্যা হলো—কোনো কোনো নতুন রাসায়নিক মাদক আইনগতভাবে শিডিউলভুক্ত হওয়ার আগেই বাজারে চলে আসছে। ফলে এসব মাদক শনাক্ত, শ্রেণিবদ্ধ ও আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সময় লাগে।
ডিএনসি'র অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, শুধু ইয়াবা বা গাঁজা নয়, নতুন সিনথেটিক মাদকও তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবির একটি চালান জব্দ করা হয় বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, কোনো সিনথেটিক মাদক জব্দ করা হলে কারবারিরা সেটি ভিন্ন নামে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো মাদক পাওয়া গেলে তা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় এবং সিনথেটিক মাদক হিসেবে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মাদক বেচাকেনা, সেবন ও নির্মূলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মাদক উদ্ধার অভিযান আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে এবং মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সিনথেটিক মাদকের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, নতুন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের জন্যও বড় হুমকি।

আপনার মতামত লিখুন