একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যের প্রতিটি ধাপ ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন ব্যাংকিং খাত পেশাদার নীতিমালার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল আর্থিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে না; বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিকীকরণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির সম্মিলিত ফল।
অর্থনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের আলোকে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে অনিয়মগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে অস্বাভাবিক ঋণ সুবিধা দেওয়া, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ এবং বড় খেলাপিদের জন্য নিয়ম বারবার শিথিল করা—এসবের মাধ্যমে একটি অপরাধপ্রবণ পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এতে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে জনআস্থার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অর্থায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করেছে। খেলাপি ঋণের অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা জমা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগে। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হওয়ায় উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। ব্যাংক লুণ্ঠন, অর্থ পাচার বা অনৈতিক ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যদি শেষ পর্যন্ত আবারও একই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ পান, তাহলে সংস্কারের সব উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সুশাসনের মূলনীতি হলো জবাবদিহিতা। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যদি অপরাধের দায় এড়ানো যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে কার্যকর তদারকি সম্ভব নয়। গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বড় ঋণ অনুমোদন, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত আইনি বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংক ধ্বসের জন্য দায়ী হলে তাদের পুনরায় ব্যাংকের পরিচালনায় ফেরার পথ বন্ধ করতে হবে। আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আমানতকারীদের সুরক্ষা, অপরাধীদের পুনর্বাসন নয়।
তৃতীয়ত, বড় খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করতে হবে। দেশ-বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করে আইনগত প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করার উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। আমানতকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে উদ্ধারকৃত সম্পদ ব্যবহার করা হলে জনআস্থা কিছুটা হলেও ফিরতে পারে।
সবশেষে, আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা টিকবে না। আমানত সুরক্ষা তহবিলের পরিধি বাড়ানো এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ আগামী দিনে বৃহত্তর অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে স্বপ্ন দেখছে, তার ভিত্তি হতে হবে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসবে কেবল কাঠামোগত সংস্কার, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকিং খাতকে সত্যিকার অর্থে মুক্ত ও শক্তিশালী করবে?

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যের প্রতিটি ধাপ ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন ব্যাংকিং খাত পেশাদার নীতিমালার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল আর্থিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে না; বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিকীকরণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির সম্মিলিত ফল।
অর্থনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের আলোকে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে অনিয়মগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে অস্বাভাবিক ঋণ সুবিধা দেওয়া, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ এবং বড় খেলাপিদের জন্য নিয়ম বারবার শিথিল করা—এসবের মাধ্যমে একটি অপরাধপ্রবণ পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এতে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে জনআস্থার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অর্থায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করেছে। খেলাপি ঋণের অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা জমা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগে। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হওয়ায় উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। ব্যাংক লুণ্ঠন, অর্থ পাচার বা অনৈতিক ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যদি শেষ পর্যন্ত আবারও একই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ পান, তাহলে সংস্কারের সব উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সুশাসনের মূলনীতি হলো জবাবদিহিতা। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যদি অপরাধের দায় এড়ানো যায়, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে কার্যকর তদারকি সম্ভব নয়। গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বড় ঋণ অনুমোদন, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত আইনি বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংক ধ্বসের জন্য দায়ী হলে তাদের পুনরায় ব্যাংকের পরিচালনায় ফেরার পথ বন্ধ করতে হবে। আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আমানতকারীদের সুরক্ষা, অপরাধীদের পুনর্বাসন নয়।
তৃতীয়ত, বড় খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করতে হবে। দেশ-বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করে আইনগত প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করার উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। আমানতকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে উদ্ধারকৃত সম্পদ ব্যবহার করা হলে জনআস্থা কিছুটা হলেও ফিরতে পারে।
সবশেষে, আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে। ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা টিকবে না। আমানত সুরক্ষা তহবিলের পরিধি বাড়ানো এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ আগামী দিনে বৃহত্তর অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে স্বপ্ন দেখছে, তার ভিত্তি হতে হবে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসবে কেবল কাঠামোগত সংস্কার, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি স্বল্পমেয়াদি ক্ষমতার সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকিং খাতকে সত্যিকার অর্থে মুক্ত ও শক্তিশালী করবে?

আপনার মতামত লিখুন