সময় ও জীবনের অগণিত নেয়ামতের মাঝে মানুষ প্রায়শই গাফেল হয়ে পড়ে। মানুষের এই বিস্মরণশীল স্বভাব এবং আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহের কথা মনে করিয়ে দিতেই কুরআনুল কারীমের অন্যতম সৌন্দর্যময় সূরা ‘আর-রহমান’-এ একটি বিশেষ আয়াত বারবার উচ্চারণ করা হয়েছে।
সূরা আর-রহমান কুরআনের ৫৫ নম্বর সূরা। হাদিস শরিফে এই সূরাকে "আরুসুল কুরআন" বা ‘কুরআনের কনে/সৌন্দর্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই সূরায় মহান আল্লাহ তাআলা একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন মোট ৩১ বার পুনরাবৃত্তি করেছেন:
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
উচ্চারণ: ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান।
অর্থ: "অতএব, তোমরা উভয়ে (মানুষ ও জিন জাতি) তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?"
(সূরা আর-রহমান)
সূরাটিতে প্রতিটি নেয়ামত, সৃষ্টির বিস্ময় এবং পরকালের প্রতিদানের বর্ণনার পর পর আল্লাহ তাআলা মানব ও জিন উভয় জাতিকে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন—যাতে তারা আল্লাহর অফুরন্ত করুণা ও তাওহীদ অনুধাবন করতে পারে।
১. মহাজাগতিক বিশৃঙ্খলাহীন গতি ও সঠিক হিসাব:
الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ
উচ্চারণ: আশশামসু ওয়াল কামারু বিহুসবান।
অর্থ: "সূর্য ও চন্দ্র নির্ধারিত হিসাব অনুসারে আবর্তিত হয়।" (সূরা আর-রহমান: ৫)
সূর্য ও চাঁদের সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল আবর্তন পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন, সময় গণনা এবং সৃষ্টির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
২. প্রকৃতির বিনম্র সমর্পণ:
وَالنَّجْمُ وَالشَّجَرُ يَسْجُدَانِ
উচ্চারণ: ওয়ান নাজমু ওয়াশ শাজারু ইয়াসজুদান।
অর্থ: "লতা-গুল্ম ও বৃক্ষরাজি (আল্লাহর চরণে) সেজদানত রয়েছে।" (সূরা আর-রহমান: ৬)
বিশ্বজগতের প্রতিটি উদ্ভিদ আল্লাহর হুকুম মেনে চলে এবং মানুষের জন্য খাদ্য ও অক্সিজেনের সংস্থান করে।
৩. দুই সমুদ্রের অলৌকিক সীমানা:
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ ○ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ
উচ্চারণ: মারাজাল বাহরাইনি ইয়ালতাকিয়ান, বাইনাহুমা বারযাখুল লা ইয়াবগিয়ান।
অর্থ: "তিনি পাশাপাশি দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।" (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
মিঠা ও নোনা পানির জলরাশি পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও সেগুলোর গুণাগুণ আলাদা থাকা প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন।
৪. গভীর সমুদ্রের সৌন্দর্য ও সম্পদ:
يَخْرُجُ مِنْهُمَا اللُّؤْلُؤُ وَالْمَرْجَانُ
উচ্চারণ: ইয়াখরুজু মিনহুমাল লুলুউ ওয়াল মারজান।
অর্থ: "উভয় সমুদ্র থেকে নির্গত হয় মুক্তা ও প্রবাল।" (সূরা আর-রহমান: ২২)
৫. মুত্তাকিদের জন্য পরকালের পরম প্রতিদান:
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ
উচ্চারণ: ওয়ালিমান খাফা মাকামা রাব্বিহি জান্নাতান।
অর্থ: "যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান (জান্নাত)।" (সূরা আর-রহমান: ৪৬)
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন জিনদের সামনে এই সূরা তিলওয়াত করেছিলেন, তখন তারা প্রতিটি ‘ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান’ আয়াতের জবাবে বলত:
"লা বিশাইইম মিন নিআমিকা রাব্বানা নুকাযযিব, ফালাকাল হামদ।"
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা আপনার কোনো নেয়ামতকেই অস্বীকার করি না, সমস্ত প্রশংসা কেবল আপনারই।" (জামে আত-তিরমিজি: ৩২৯১)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
উচ্চারণ: লাইন শাকারতুম লাআযীদান্নাকুম।
অর্থ: "যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।" (সূরা ইবরাহীম: ৭)
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—শ্বাস-প্রশ্বাস, দৃষ্টিশক্তি, সুস্থতা, রিজিক ও নিরাপত্তা—আল্লাহর পক্ষ থেকে এক একটি মহান নেয়ামত। তাই প্রতিনিয়ত জীবনের সব অবস্থায় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করে তাঁর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬
সময় ও জীবনের অগণিত নেয়ামতের মাঝে মানুষ প্রায়শই গাফেল হয়ে পড়ে। মানুষের এই বিস্মরণশীল স্বভাব এবং আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহের কথা মনে করিয়ে দিতেই কুরআনুল কারীমের অন্যতম সৌন্দর্যময় সূরা ‘আর-রহমান’-এ একটি বিশেষ আয়াত বারবার উচ্চারণ করা হয়েছে।
সূরা আর-রহমান কুরআনের ৫৫ নম্বর সূরা। হাদিস শরিফে এই সূরাকে "আরুসুল কুরআন" বা ‘কুরআনের কনে/সৌন্দর্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই সূরায় মহান আল্লাহ তাআলা একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন মোট ৩১ বার পুনরাবৃত্তি করেছেন:
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
উচ্চারণ: ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান।
অর্থ: "অতএব, তোমরা উভয়ে (মানুষ ও জিন জাতি) তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?"
(সূরা আর-রহমান)
সূরাটিতে প্রতিটি নেয়ামত, সৃষ্টির বিস্ময় এবং পরকালের প্রতিদানের বর্ণনার পর পর আল্লাহ তাআলা মানব ও জিন উভয় জাতিকে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন—যাতে তারা আল্লাহর অফুরন্ত করুণা ও তাওহীদ অনুধাবন করতে পারে।
১. মহাজাগতিক বিশৃঙ্খলাহীন গতি ও সঠিক হিসাব:
الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ
উচ্চারণ: আশশামসু ওয়াল কামারু বিহুসবান।
অর্থ: "সূর্য ও চন্দ্র নির্ধারিত হিসাব অনুসারে আবর্তিত হয়।" (সূরা আর-রহমান: ৫)
সূর্য ও চাঁদের সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল আবর্তন পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন, সময় গণনা এবং সৃষ্টির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
২. প্রকৃতির বিনম্র সমর্পণ:
وَالنَّجْمُ وَالشَّجَرُ يَسْجُدَانِ
উচ্চারণ: ওয়ান নাজমু ওয়াশ শাজারু ইয়াসজুদান।
অর্থ: "লতা-গুল্ম ও বৃক্ষরাজি (আল্লাহর চরণে) সেজদানত রয়েছে।" (সূরা আর-রহমান: ৬)
বিশ্বজগতের প্রতিটি উদ্ভিদ আল্লাহর হুকুম মেনে চলে এবং মানুষের জন্য খাদ্য ও অক্সিজেনের সংস্থান করে।
৩. দুই সমুদ্রের অলৌকিক সীমানা:
مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ ○ بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ
উচ্চারণ: মারাজাল বাহরাইনি ইয়ালতাকিয়ান, বাইনাহুমা বারযাখুল লা ইয়াবগিয়ান।
অর্থ: "তিনি পাশাপাশি দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক আড়াল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।" (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
মিঠা ও নোনা পানির জলরাশি পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও সেগুলোর গুণাগুণ আলাদা থাকা প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন।
৪. গভীর সমুদ্রের সৌন্দর্য ও সম্পদ:
يَخْرُجُ مِنْهُمَا اللُّؤْلُؤُ وَالْمَرْجَانُ
উচ্চারণ: ইয়াখরুজু মিনহুমাল লুলুউ ওয়াল মারজান।
অর্থ: "উভয় সমুদ্র থেকে নির্গত হয় মুক্তা ও প্রবাল।" (সূরা আর-রহমান: ২২)
৫. মুত্তাকিদের জন্য পরকালের পরম প্রতিদান:
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ
উচ্চারণ: ওয়ালিমান খাফা মাকামা রাব্বিহি জান্নাতান।
অর্থ: "যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান (জান্নাত)।" (সূরা আর-রহমান: ৪৬)
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন জিনদের সামনে এই সূরা তিলওয়াত করেছিলেন, তখন তারা প্রতিটি ‘ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান’ আয়াতের জবাবে বলত:
"লা বিশাইইম মিন নিআমিকা রাব্বানা নুকাযযিব, ফালাকাল হামদ।"
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমরা আপনার কোনো নেয়ামতকেই অস্বীকার করি না, সমস্ত প্রশংসা কেবল আপনারই।" (জামে আত-তিরমিজি: ৩২৯১)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
উচ্চারণ: লাইন শাকারতুম লাআযীদান্নাকুম।
অর্থ: "যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।" (সূরা ইবরাহীম: ৭)
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত—শ্বাস-প্রশ্বাস, দৃষ্টিশক্তি, সুস্থতা, রিজিক ও নিরাপত্তা—আল্লাহর পক্ষ থেকে এক একটি মহান নেয়ামত। তাই প্রতিনিয়ত জীবনের সব অবস্থায় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করে তাঁর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আপনার মতামত লিখুন