দিনের বেলা রোদে পুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় ঘুরে ঘুরে ফুল কিংবা বোতলজাত পানি বিক্রি করে ১০ বছর বয়সী শিশু রাকিব (ছদ্মনাম) ও তার ছোট বোন। একই এলাকায় ক্র্যাচে ভর করে ফুল বেচতে দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারানো আরেক শিশু সাদিককে (ছদ্মনাম)।
প্রথম দেখায় শিশুদের এই পথচলা নিছক বেঁচে থাকার সংগ্রাম মনে হলেও, সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। তাদের কোমল হাতে উঠে আসে গাঁজা ও ইয়াবাসহ নানা মরণনেশা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও টিএসসি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে কৌশল বদলেছে মাদক কারবারিরা। পুলিশ বা পথচারীদের সন্দেহ এড়াতে তারা পথশিশুদের ব্যবহার করছে মাদক সরবরাহের ‘কুরিয়ার’ হিসেবে। বিনিময়ে শিশুদের দেওয়া হয় নামমাত্র কিছু টাকা। আইনি কাঠামোর জটিলতাকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এই চক্র; আটক হলেও শিশু আইনের কারণে শিশুরা দ্রুত জামিনে বা মুক্ত পেয়ে যায়। ফলে কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
উদ্যানের ভাসমান অধিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা কয়েকটি চক্র এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় সূত্রমতে, নবী, অলিকা, রেখা ও রাব্বির নেতৃত্বাধীন একাধিক দল বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সক্রিয় রয়েছে। নতুনদের ধাপে ধাপে এ ব্যবসায় যুক্ত করে নিয়ন্ত্রণের বলয় তৈরি করা হয়। অভিযানে পুলিশ এলে কৌশলে ভিড়ের মধ্যে মাদক লুকিয়ে ফেলা হয় বা চত্বরে ফেলে দেওয়া হয়।
মাদক ও ভবঘুরেদের এই অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত বছরের ১৩ মে উদ্যান এলাকায় মাদকসেবীদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন ঢাবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজনকে গ্রেফতার এবং উদ্যানের কিছু প্রবেশপথ বন্ধ করা হলেও বর্তমানে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরেছে এলাকাটি। তিন নেতার মাজারসংলগ্ন অংশে উচ্ছেদ হওয়া ঝুপড়িগুলো পুনরায় গড়ে উঠেছে, যা রাতে রূপ নেয় মাদকের আখড়ায়।
ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম জানান, সীমিত লোকবল নিয়ে পুরো এলাকায় একসাথে নজরদারি কঠিন হলেও তারা দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। অন্যদিকে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং যেকোনো অবৈধ অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পথশিশুদের মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসনিক লোকদেখানো পদক্ষেপের পরিবর্তে অবিলম্বে পথশিশুদের জন্য পুনর্বাসন, নিখরচায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল মাদক সিন্ডিকেটকে সমূলে উপাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬
দিনের বেলা রোদে পুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় ঘুরে ঘুরে ফুল কিংবা বোতলজাত পানি বিক্রি করে ১০ বছর বয়সী শিশু রাকিব (ছদ্মনাম) ও তার ছোট বোন। একই এলাকায় ক্র্যাচে ভর করে ফুল বেচতে দেখা যায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারানো আরেক শিশু সাদিককে (ছদ্মনাম)।
প্রথম দেখায় শিশুদের এই পথচলা নিছক বেঁচে থাকার সংগ্রাম মনে হলেও, সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। তাদের কোমল হাতে উঠে আসে গাঁজা ও ইয়াবাসহ নানা মরণনেশা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও টিএসসি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে কৌশল বদলেছে মাদক কারবারিরা। পুলিশ বা পথচারীদের সন্দেহ এড়াতে তারা পথশিশুদের ব্যবহার করছে মাদক সরবরাহের ‘কুরিয়ার’ হিসেবে। বিনিময়ে শিশুদের দেওয়া হয় নামমাত্র কিছু টাকা। আইনি কাঠামোর জটিলতাকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এই চক্র; আটক হলেও শিশু আইনের কারণে শিশুরা দ্রুত জামিনে বা মুক্ত পেয়ে যায়। ফলে কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
উদ্যানের ভাসমান অধিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা কয়েকটি চক্র এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয় সূত্রমতে, নবী, অলিকা, রেখা ও রাব্বির নেতৃত্বাধীন একাধিক দল বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সক্রিয় রয়েছে। নতুনদের ধাপে ধাপে এ ব্যবসায় যুক্ত করে নিয়ন্ত্রণের বলয় তৈরি করা হয়। অভিযানে পুলিশ এলে কৌশলে ভিড়ের মধ্যে মাদক লুকিয়ে ফেলা হয় বা চত্বরে ফেলে দেওয়া হয়।
মাদক ও ভবঘুরেদের এই অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত বছরের ১৩ মে উদ্যান এলাকায় মাদকসেবীদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন ঢাবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকজনকে গ্রেফতার এবং উদ্যানের কিছু প্রবেশপথ বন্ধ করা হলেও বর্তমানে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরেছে এলাকাটি। তিন নেতার মাজারসংলগ্ন অংশে উচ্ছেদ হওয়া ঝুপড়িগুলো পুনরায় গড়ে উঠেছে, যা রাতে রূপ নেয় মাদকের আখড়ায়।
ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম জানান, সীমিত লোকবল নিয়ে পুরো এলাকায় একসাথে নজরদারি কঠিন হলেও তারা দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। অন্যদিকে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং যেকোনো অবৈধ অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পথশিশুদের মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার কেবল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসনিক লোকদেখানো পদক্ষেপের পরিবর্তে অবিলম্বে পথশিশুদের জন্য পুনর্বাসন, নিখরচায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল মাদক সিন্ডিকেটকে সমূলে উপাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন