২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, টানা ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে পতন ঘটে টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তীব্র জনরোষ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। পরে তিনি ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যও নিহত হন। ওই দিন বিকেলে সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টারা শেখ হাসিনাকে জানান, পরিস্থিতি কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছেন না। তবে শুরুতে শেখ হাসিনা পরিস্থিতি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জানান, পরিস্থিতি আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ৫ আগস্ট সকালে গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জবাবে কর্মকর্তারা জানান, দেশের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কঠোর অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব নয়। একপর্যায়ে কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে তাকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝানোর অনুরোধ জানান। পরে শেখ রেহানা বড় বোনের সঙ্গে কথা বলেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। এরপর শেখ হাসিনা পদত্যাগে সম্মত হন। সেদিন সকাল থেকেই কঠোর কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেন। বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। একই সময়ে দেশের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরের দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। মাঠে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে জানান, খুব শিগগিরই একটি "সুখবর" আসছে। এর পরপরই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পদত্যাগের পর গণভবন থেকে একটি হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা বিমানবন্দরে যান। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে করে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা হয়ে দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পরদিন দেশটির পার্লামেন্টে জানান, শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত নোটিশে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান। ভারত জানায়, তিনি আগরতলা পৌঁছাতে পারলে সেখান থেকে দিল্লিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি দিল্লির হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে দেশটির মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। লোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে এস জয়শঙ্কর বলেন, কারফিউ থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা ঢাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের অবস্থানে পৌঁছে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং জরুরি ভিত্তিতে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান। এরপর প্রয়োজনীয় ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে তাকে নিরাপদে দিল্লিতে নেওয়া হয়।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, টানা ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে পতন ঘটে টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তীব্র জনরোষ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। পরে তিনি ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যও নিহত হন। ওই দিন বিকেলে সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টারা শেখ হাসিনাকে জানান, পরিস্থিতি কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছেন না। তবে শুরুতে শেখ হাসিনা পরিস্থিতি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেছিলেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জানান, পরিস্থিতি আর আগের মতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ৫ আগস্ট সকালে গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জবাবে কর্মকর্তারা জানান, দেশের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কঠোর অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব নয়। একপর্যায়ে কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করে তাকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝানোর অনুরোধ জানান। পরে শেখ রেহানা বড় বোনের সঙ্গে কথা বলেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। এরপর শেখ হাসিনা পদত্যাগে সম্মত হন। সেদিন সকাল থেকেই কঠোর কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যোগ দেন। বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। একই সময়ে দেশের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরের দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। মাঠে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে জানান, খুব শিগগিরই একটি "সুখবর" আসছে। এর পরপরই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পদত্যাগের পর গণভবন থেকে একটি হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা বিমানবন্দরে যান। এরপর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে করে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা হয়ে দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পরদিন দেশটির পার্লামেন্টে জানান, শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত নোটিশে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান। ভারত জানায়, তিনি আগরতলা পৌঁছাতে পারলে সেখান থেকে দিল্লিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি দিল্লির হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে দেশটির মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। লোকসভায় দেওয়া বক্তব্যে এস জয়শঙ্কর বলেন, কারফিউ থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা ঢাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের অবস্থানে পৌঁছে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং জরুরি ভিত্তিতে ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান। এরপর প্রয়োজনীয় ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে তাকে নিরাপদে দিল্লিতে নেওয়া হয়।

আপনার মতামত লিখুন