সালমান শাহর মৃত্যু থেকে হত্যা মামলা: সামিরা হকের পরিচয়, দাম্পত্য ইতিহাস ও ১১ আসামির মামলার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যু তিন দশক পরও রহস্য ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত—তিন পর্যায়েই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে সালমান শাহর পরিবার এসব সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘটনাটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
কে এই সামিরা হক?
সামিরা হক মূলত সালমান শাহর স্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হন। প্রকাশিত জীবনী ও সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক উইকেটকিপার ও অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা। তাঁর মা লুসি চট্টগ্রামে বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামিরা নিজেও বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিয়ের পর সালমান শাহর কয়েকটি চলচ্চিত্রে পোশাক পরিকল্পনা ও স্টাইলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে তাঁর জন্মতারিখ, শিক্ষাজীবনসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য ব্যবহার না করাই সাংবাদিকতার দিক থেকে নিরাপদ।
সালমান শাহর সঙ্গে বিয়ে
সালমান শাহ ও সামিরা হকের বিয়ে হয় ১২ আগস্ট ১৯৯২। তখন সালমান শাহ চলচ্চিত্রে বড় তারকা হয়ে ওঠার আগের পর্যায়ে ছিলেন। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে তাঁদের সম্পর্ককে প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বিয়ের আগে প্রায় ছয় মাস তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে সামিরার বাবা শফিকুল হক হীরার বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।
বিয়ের পর সামিরা সালমানের চলচ্চিত্র-জীবনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দুটি চলচ্চিত্রে তাঁর পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে তাঁদের দাম্পত্যজীবন নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সালমান শাহর সহশিল্পী শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং দাম্পত্য কলহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসবের অনেকটাই ছিল সংবাদমাধ্যমের আলোচনা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য; সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: কী ঘটেছিল?
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার বাসায় সালমান শাহর মরদেহ পাওয়া যায়। তৎকালীন তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে বাসার ড্রেসিংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ওই ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া।
প্রথম তদন্ত: সিআইডি
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর পরিবার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করে।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত
২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান। দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পিবিআই তদন্ত
পরিবারের আপত্তির পর ২০১৬ সালে আদালত পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। পিবিআই ২০২০ সালে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। তাদের প্রতিবেদনে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২১ সালে আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে কয়েকটি সম্ভাব্য মানসিক ও পারিবারিক কারণের কথা উল্লেখ করেছিল—এর মধ্যে সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েনসহ কয়েকটি বিষয় ছিল। এগুলো ছিল তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ; আদালতের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হত্যার কারণ নয়।
২০২৫ সালে কেন নতুন করে হত্যা মামলা?
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালে আদালত সালমান শাহর ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ সংক্রান্ত মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর ২১ অক্টোবর ২০২৫ রাতে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়।
মামলাটি করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার ১১ আসামি
এজাহারে নাম থাকা ১১ জন হলেন—
১. সামিরা হক — সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী
২. লতিফা হক লুসি — সামিরার মা
৩. আজিজ মোহাম্মদ ভাই — ব্যবসায়ী
৪. আশরাফুল হক ওরফে ডন — চলচ্চিত্র অভিনেতা
৫. ডেভিড
৬. জাভেদ
৭. ফারুক
৮. রুবি
৯. আবদুস সাত্তার
১০. সাজু
১১. রিজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদ
আসামিদের এই তালিকা বিভিন্ন আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে একইভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আসামি হওয়া মানেই অপরাধী প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলাটি তদন্তাধীন এবং আদালতে অভিযোগের সত্যতা বিচারাধীন।
সামিরার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?
নতুন হত্যা মামলার এজাহারে সামিরা হকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
অন্যদিকে পূর্ববর্তী সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পিবিআই—তিনটি পৃথক তদন্তপ্রক্রিয়ায় হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল।
অতএব, বর্তমান মামলাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত বিষয় হলো—পুরোনো তদন্তের সিদ্ধান্ত এবং নতুন হত্যা মামলার অভিযোগের মধ্যে পার্থক্যটি পাঠকের সামনে পরিষ্কার রাখা।
সালমানের মৃত্যুর পর সামিরার জীবন
সালমান শাহর মৃত্যুর পর সামিরা দীর্ঘ সময় আলোচনার বাইরে ছিলেন। বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে তিনি সালমানের বন্ধু ব্যবসায়ী মোশতাক ওয়াইজকে বিয়ে করেন। ২০২১ সালে তাঁর ওই দাম্পত্যের অবসান এবং সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক ইশতিয়াক আহমেদের সঙ্গে তৃতীয় বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়।
তাঁর পরবর্তী ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু অসঙ্গতিও রয়েছে। তাই নিশ্চিত নথি ছাড়া তাঁর বর্তমান পারিবারিক অবস্থা বা ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
৯ আগস্ট ২০২৬: অভিনেতা ডনের গ্রেপ্তার
মামলাটিতে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয় ৯ আগস্ট ২০২৬। মামলার ৪ নম্বর আসামি চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে বিষয়টি জানানোর পর তাঁকে সিআইডি হেফাজতে নেয়। পরে তাঁকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, ডন মামলার এজাহারভুক্ত ৪ নম্বর আসামি এবং তিনি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়।
শুনানি শেষে আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ডনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
আদালতের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মামলার তদন্তে পাওয়া কিছু অভিযোগ তুলে ধরে। এর মধ্যে রিজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদের কথিত স্বীকারোক্তির উল্লেখ করা হয় এবং সালমান শাহকে হত্যার জন্য অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পনার অভিযোগ করা হয়।
তবে এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্য ও মামলার অভিযোগ—চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়। আদালতে সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মামলাটি এখন কোথায়?
২০২৬ সালে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ একাধিকবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২৩ জুলাই ২০২৬ ঢাকার একটি আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেন।
অর্থাৎ ১০ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত—
হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন;
১১ জন এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন;
অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন;
সামিরা হকসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি;
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৩০ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত রয়েছে।
অনুসন্ধানের মূল প্রশ্নগুলো
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর নতুন হত্যা মামলা সামনে আসায় কয়েকটি প্রশ্ন এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, পূর্বের তিনটি তদন্তে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যুর সিদ্ধান্ত এলেও নতুন মামলায় হত্যার অভিযোগের ভিত্তি কী?
দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ সালের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসা ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে নতুন তদন্তে পাওয়া তথ্যের মিল-অমিল কী?
তৃতীয়ত, মামলার এজাহারে ১১ জনের নাম কী নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এসেছে?
চতুর্থত, পুরোনো তদন্তের নথি, সাক্ষ্য ও ফরেনসিক উপাত্ত পুনর্মূল্যায়নে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না?
পঞ্চমত, ডনের বিরুদ্ধে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ যে বক্তব্য দিয়েছে, তার সমর্থনে তদন্তে কী কী নথি বা সাক্ষ্য রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি। ১৯৯৬ সালের ঘটনা থেকে ২০২৫ সালের হত্যা মামলা এবং ২০২৬ সালে ডনের গ্রেপ্তার—প্রতিটি পর্যায়েই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগ, তদন্তের পর্যবেক্ষণ এবং আদালতে প্রমাণিত সত্য—এই তিনটিকে আলাদা রাখা। সামিরা হকসহ ১১ জন বর্তমানে মামলার আসামি; তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার এখনো শেষ হয়নি। একইভাবে ডনের গ্রেপ্তারও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হলে মামলাটির গতিপথ এবং ১৯৯৬ সালের মৃত্যুকে ঘিরে নতুন কোনো প্রমাণ সামনে আসে কি না—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬
সালমান শাহর মৃত্যু থেকে হত্যা মামলা: সামিরা হকের পরিচয়, দাম্পত্য ইতিহাস ও ১১ আসামির মামলার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যু তিন দশক পরও রহস্য ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত—তিন পর্যায়েই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে সালমান শাহর পরিবার এসব সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘটনাটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
কে এই সামিরা হক?
সামিরা হক মূলত সালমান শাহর স্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হন। প্রকাশিত জীবনী ও সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক উইকেটকিপার ও অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা। তাঁর মা লুসি চট্টগ্রামে বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামিরা নিজেও বিউটি পার্লার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিয়ের পর সালমান শাহর কয়েকটি চলচ্চিত্রে পোশাক পরিকল্পনা ও স্টাইলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে তাঁর জন্মতারিখ, শিক্ষাজীবনসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। ফলে এসব বিষয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য ব্যবহার না করাই সাংবাদিকতার দিক থেকে নিরাপদ।
সালমান শাহর সঙ্গে বিয়ে
সালমান শাহ ও সামিরা হকের বিয়ে হয় ১২ আগস্ট ১৯৯২। তখন সালমান শাহ চলচ্চিত্রে বড় তারকা হয়ে ওঠার আগের পর্যায়ে ছিলেন। প্রকাশিত সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে তাঁদের সম্পর্ককে প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বিয়ের আগে প্রায় ছয় মাস তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে সামিরার বাবা শফিকুল হক হীরার বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।
বিয়ের পর সামিরা সালমানের চলচ্চিত্র-জীবনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দুটি চলচ্চিত্রে তাঁর পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে তাঁদের দাম্পত্যজীবন নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সালমান শাহর সহশিল্পী শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং দাম্পত্য কলহ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসবের অনেকটাই ছিল সংবাদমাধ্যমের আলোচনা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য; সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: কী ঘটেছিল?
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার বাসায় সালমান শাহর মরদেহ পাওয়া যায়। তৎকালীন তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে বাসার ড্রেসিংরুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ওই ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া।
প্রথম তদন্ত: সিআইডি
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর পরিবার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করে।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত
২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান। দীর্ঘ সময় পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনেও মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পিবিআই তদন্ত
পরিবারের আপত্তির পর ২০১৬ সালে আদালত পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। পিবিআই ২০২০ সালে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। তাদের প্রতিবেদনে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২১ সালে আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে কয়েকটি সম্ভাব্য মানসিক ও পারিবারিক কারণের কথা উল্লেখ করেছিল—এর মধ্যে সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েনসহ কয়েকটি বিষয় ছিল। এগুলো ছিল তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ; আদালতের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হত্যার কারণ নয়।
২০২৫ সালে কেন নতুন করে হত্যা মামলা?
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালে আদালত সালমান শাহর ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ সংক্রান্ত মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর ২১ অক্টোবর ২০২৫ রাতে রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়।
মামলাটি করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার ১১ আসামি
এজাহারে নাম থাকা ১১ জন হলেন—
১. সামিরা হক — সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী
২. লতিফা হক লুসি — সামিরার মা
৩. আজিজ মোহাম্মদ ভাই — ব্যবসায়ী
৪. আশরাফুল হক ওরফে ডন — চলচ্চিত্র অভিনেতা
৫. ডেভিড
৬. জাভেদ
৭. ফারুক
৮. রুবি
৯. আবদুস সাত্তার
১০. সাজু
১১. রিজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদ
আসামিদের এই তালিকা বিভিন্ন আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে একইভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আসামি হওয়া মানেই অপরাধী প্রমাণিত হওয়া নয়। মামলাটি তদন্তাধীন এবং আদালতে অভিযোগের সত্যতা বিচারাধীন।
সামিরার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?
নতুন হত্যা মামলার এজাহারে সামিরা হকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা এখনো বিচারিকভাবে নির্ধারিত হয়নি।
অন্যদিকে পূর্ববর্তী সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং পিবিআই—তিনটি পৃথক তদন্তপ্রক্রিয়ায় হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল।
অতএব, বর্তমান মামলাকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত বিষয় হলো—পুরোনো তদন্তের সিদ্ধান্ত এবং নতুন হত্যা মামলার অভিযোগের মধ্যে পার্থক্যটি পাঠকের সামনে পরিষ্কার রাখা।
সালমানের মৃত্যুর পর সামিরার জীবন
সালমান শাহর মৃত্যুর পর সামিরা দীর্ঘ সময় আলোচনার বাইরে ছিলেন। বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে তিনি সালমানের বন্ধু ব্যবসায়ী মোশতাক ওয়াইজকে বিয়ে করেন। ২০২১ সালে তাঁর ওই দাম্পত্যের অবসান এবং সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক ইশতিয়াক আহমেদের সঙ্গে তৃতীয় বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়।
তাঁর পরবর্তী ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু অসঙ্গতিও রয়েছে। তাই নিশ্চিত নথি ছাড়া তাঁর বর্তমান পারিবারিক অবস্থা বা ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
৯ আগস্ট ২০২৬: অভিনেতা ডনের গ্রেপ্তার
মামলাটিতে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয় ৯ আগস্ট ২০২৬। মামলার ৪ নম্বর আসামি চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে বিষয়টি জানানোর পর তাঁকে সিআইডি হেফাজতে নেয়। পরে তাঁকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করে, ডন মামলার এজাহারভুক্ত ৪ নম্বর আসামি এবং তিনি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়।
শুনানি শেষে আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ডনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
আদালতের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মামলার তদন্তে পাওয়া কিছু অভিযোগ তুলে ধরে। এর মধ্যে রিজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদের কথিত স্বীকারোক্তির উল্লেখ করা হয় এবং সালমান শাহকে হত্যার জন্য অর্থের বিনিময়ে পরিকল্পনার অভিযোগ করা হয়।
তবে এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্য ও মামলার অভিযোগ—চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়। আদালতে সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মামলাটি এখন কোথায়?
২০২৬ সালে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ একাধিকবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২৩ জুলাই ২০২৬ ঢাকার একটি আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেন।
অর্থাৎ ১০ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত—
হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন;
১১ জন এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন;
অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন;
সামিরা হকসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি;
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৩০ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারিত রয়েছে।
অনুসন্ধানের মূল প্রশ্নগুলো
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর নতুন হত্যা মামলা সামনে আসায় কয়েকটি প্রশ্ন এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, পূর্বের তিনটি তদন্তে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যুর সিদ্ধান্ত এলেও নতুন মামলায় হত্যার অভিযোগের ভিত্তি কী?
দ্বিতীয়ত, ১৯৯৬ সালের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসা ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে নতুন তদন্তে পাওয়া তথ্যের মিল-অমিল কী?
তৃতীয়ত, মামলার এজাহারে ১১ জনের নাম কী নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এসেছে?
চতুর্থত, পুরোনো তদন্তের নথি, সাক্ষ্য ও ফরেনসিক উপাত্ত পুনর্মূল্যায়নে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না?
পঞ্চমত, ডনের বিরুদ্ধে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ যে বক্তব্য দিয়েছে, তার সমর্থনে তদন্তে কী কী নথি বা সাক্ষ্য রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলোর একটি। ১৯৯৬ সালের ঘটনা থেকে ২০২৫ সালের হত্যা মামলা এবং ২০২৬ সালে ডনের গ্রেপ্তার—প্রতিটি পর্যায়েই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগ, তদন্তের পর্যবেক্ষণ এবং আদালতে প্রমাণিত সত্য—এই তিনটিকে আলাদা রাখা। সামিরা হকসহ ১১ জন বর্তমানে মামলার আসামি; তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার এখনো শেষ হয়নি। একইভাবে ডনের গ্রেপ্তারও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হলে মামলাটির গতিপথ এবং ১৯৯৬ সালের মৃত্যুকে ঘিরে নতুন কোনো প্রমাণ সামনে আসে কি না—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন