এরপর নারীদের ঋণদানের কাহিনী তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, এরপর যে কাজ শুরু করলাম, সেটা নারীদের খুব পছন্দ হলো। নারীদের হাতে ঋণ দিলাম, ৫ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা। ৫ টাকা, ১০টাকায় মানুষ যে এত খুশি হতে পারে জানা ছিল না, কোনোদিন ভাবিওনি। আমি যে মাগনা টাকা দিয়েছি তা না, তাদের বললাম- কাজ করে রোজগার করে টাকা ফেরত দিতে হবে। তাতেই তারা খুশি। অনেক কাহিনী শুনলাম। তাদের অনেকে তাদের নিজের নাম পর্যন্ত বলতে পারে না। আমাদের সমাজ এমন, তাদের নাম জানারও সুযোগ করে দেয় না। ছোটবেলায় অমুকের মেয়ে, বিয়ে হলে অমুকের বউ, মা হলে অমুকের মা, সে যে কে সে নিজেও জানে না। আমরা প্রথম চেষ্টা করলাম, আমাদের ছাত্রীদের দিয়ে কোনোভাবে তার নামটা বের করার জন্য, হয়তো কোনো একসময় তার নাম একটা ছিল অথবা মনে না পড়লে একটা নতুন নাম দেওয়া যাতে করে সেটা সে লিখতে পারে। এভাবে লেখা শেখানো। এ লেখা শেখাতে গিয়ে তার জীবনের অনেক কাহিনি আসলো। প্রতি কাহিনি একটার চাইতে একটা চমৎকার।
এর থেকে আমি একটা সিদ্ধান্তে আসলাম, সভা-সমিতিতে বললাম, লেখালেখিতে বললাম- ঋণ মানুষের মানবিক অধিকার। মানুষ হাসাহাসি করল। আপনি ঋণের কথা বলেন, অধিকারের কথাও বলেন- এটা কী ধরনের কথা! অর্থনীতিতে তো অধিকারের বিষয় নেই। অনেক খটকা, তা-ও আবার মানবিক অধিকার, একটা খটকার পর আরেকটা খটকা। তারপর বললাম, আমরা দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাবো। বলে- আপনি কে জাদুঘরে পাঠাবেন। আমি বললাম- আমি আপনার মতোই একজন মানুষ। তখন বলল- এটা আপনার কাজ না, এটা সরকারের কাজ। আমি বললাম- আমি আমার কাজ করি, সরকার আমাকে বাধা দিলে দেখা যাবে।
ব্যবসাকেন্দ্রিক নয়, অর্থনীতি হবে মানুষের জন্য–এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে জোবরার নারীদের কাছ থেকে নতুন অর্থনীতি শিখলাম। জোবরা গ্রাম আমার জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। আজ পর্যন্ত যা করে যাচ্ছি, তা জোবরা থেকে যা শিখেছি তার বহিঃপ্রকাশ। আজ অর্থনীতি যা পড়াচ্ছি, সেটা ব্যবসার অর্থনীতি, মানুষের অর্থনীতি না। আমাদের মানুষের অর্থনীতি গড়তে হবে। আমাদের অর্থনীতি যদি শুরু করতে হয়, মানুষকে দিয়ে শুরু করতে হবে, ব্যবসাকে দিয়ে নয়। অথচ আমরা ব্যবসাকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তুললাম, এটা আত্মঘাতী সভ্যতা, এটা টিকবে না।
ওই যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি লেখাপড়া শুরু করলাম, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই আমাকে বলল- এ বিদ্যায় পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, এর থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তখন আরও বড় আকারের জিনিসের মধ্যে ঢুকলাম। বললাম আমাদের নতুন সভ্যতা গড়তে হবে। আমার সহকর্মী যারা আছেন, অর্থনীতির পাঠদান করেন, লেখালেখি করেন তারা তো আগেই আমাকে ত্যাজ্য করেছেন, তারা এটা নিয়ে কথা বললে একেবারেই শেষ করে দেবেন কথাবার্তা।
তিনি বলেন, কিন্তু আমার মাথায় সেটা রয়ে গেল যে আমাদের আবার নতুন সূত্রে যাত্রা শুরু করতে হবে, যে অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষ, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কীভাবে নিজেকে আবিষ্কার করার প্রবণতা এবং যেদিকে তাকে ছুটিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে বের করে আনা। এগুলো সবকিছুর বীজ বপন হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাশের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে (জোবরা)। এজন্য আমি চবি ও জোবরার কাছে কৃতজ্ঞ। এটা করে যে কোনোদিন একটা নোবেল পুরস্কার পাওয়া যাবে, কখনও মনে আসেনি। তবে লোকজন বলাবলি করেছিল মাঝে মাঝে।
সমাবর্তীদের উদ্দেশে ড. ইউনূস বলেন, সমাবর্তন একজন মানুষের জীবনে একটি মস্তবড় ঘটনা। সনদ নেবে, ছবিটি সংরক্ষণ করবে, সেটা সবাইকে দেখায়, সেই বিশেষ দিনটি আজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা কত তাড়াতাড়ি চলে যায়, কেটে যায় বোঝা যায় না। যখন শেষ হয়ে যায়, তখন মনে বড় কষ্ট লাগে। জীবনের একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো, নতুন অধ্যায়ের শুরু।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইয়াহ্ইয়া আখতারের সভাপতিত্বে এতে শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফয়েজ বক্তব্য দেন। 
শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৫
এরপর নারীদের ঋণদানের কাহিনী তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, এরপর যে কাজ শুরু করলাম, সেটা নারীদের খুব পছন্দ হলো। নারীদের হাতে ঋণ দিলাম, ৫ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা। ৫ টাকা, ১০টাকায় মানুষ যে এত খুশি হতে পারে জানা ছিল না, কোনোদিন ভাবিওনি। আমি যে মাগনা টাকা দিয়েছি তা না, তাদের বললাম- কাজ করে রোজগার করে টাকা ফেরত দিতে হবে। তাতেই তারা খুশি। অনেক কাহিনী শুনলাম। তাদের অনেকে তাদের নিজের নাম পর্যন্ত বলতে পারে না। আমাদের সমাজ এমন, তাদের নাম জানারও সুযোগ করে দেয় না। ছোটবেলায় অমুকের মেয়ে, বিয়ে হলে অমুকের বউ, মা হলে অমুকের মা, সে যে কে সে নিজেও জানে না। আমরা প্রথম চেষ্টা করলাম, আমাদের ছাত্রীদের দিয়ে কোনোভাবে তার নামটা বের করার জন্য, হয়তো কোনো একসময় তার নাম একটা ছিল অথবা মনে না পড়লে একটা নতুন নাম দেওয়া যাতে করে সেটা সে লিখতে পারে। এভাবে লেখা শেখানো। এ লেখা শেখাতে গিয়ে তার জীবনের অনেক কাহিনি আসলো। প্রতি কাহিনি একটার চাইতে একটা চমৎকার।
এর থেকে আমি একটা সিদ্ধান্তে আসলাম, সভা-সমিতিতে বললাম, লেখালেখিতে বললাম- ঋণ মানুষের মানবিক অধিকার। মানুষ হাসাহাসি করল। আপনি ঋণের কথা বলেন, অধিকারের কথাও বলেন- এটা কী ধরনের কথা! অর্থনীতিতে তো অধিকারের বিষয় নেই। অনেক খটকা, তা-ও আবার মানবিক অধিকার, একটা খটকার পর আরেকটা খটকা। তারপর বললাম, আমরা দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাবো। বলে- আপনি কে জাদুঘরে পাঠাবেন। আমি বললাম- আমি আপনার মতোই একজন মানুষ। তখন বলল- এটা আপনার কাজ না, এটা সরকারের কাজ। আমি বললাম- আমি আমার কাজ করি, সরকার আমাকে বাধা দিলে দেখা যাবে।
ব্যবসাকেন্দ্রিক নয়, অর্থনীতি হবে মানুষের জন্য–এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে জোবরার নারীদের কাছ থেকে নতুন অর্থনীতি শিখলাম। জোবরা গ্রাম আমার জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। আজ পর্যন্ত যা করে যাচ্ছি, তা জোবরা থেকে যা শিখেছি তার বহিঃপ্রকাশ। আজ অর্থনীতি যা পড়াচ্ছি, সেটা ব্যবসার অর্থনীতি, মানুষের অর্থনীতি না। আমাদের মানুষের অর্থনীতি গড়তে হবে। আমাদের অর্থনীতি যদি শুরু করতে হয়, মানুষকে দিয়ে শুরু করতে হবে, ব্যবসাকে দিয়ে নয়। অথচ আমরা ব্যবসাকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তুললাম, এটা আত্মঘাতী সভ্যতা, এটা টিকবে না।
ওই যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি লেখাপড়া শুরু করলাম, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই আমাকে বলল- এ বিদ্যায় পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, এর থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তখন আরও বড় আকারের জিনিসের মধ্যে ঢুকলাম। বললাম আমাদের নতুন সভ্যতা গড়তে হবে। আমার সহকর্মী যারা আছেন, অর্থনীতির পাঠদান করেন, লেখালেখি করেন তারা তো আগেই আমাকে ত্যাজ্য করেছেন, তারা এটা নিয়ে কথা বললে একেবারেই শেষ করে দেবেন কথাবার্তা।
তিনি বলেন, কিন্তু আমার মাথায় সেটা রয়ে গেল যে আমাদের আবার নতুন সূত্রে যাত্রা শুরু করতে হবে, যে অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষ, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কীভাবে নিজেকে আবিষ্কার করার প্রবণতা এবং যেদিকে তাকে ছুটিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে বের করে আনা। এগুলো সবকিছুর বীজ বপন হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাশের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে (জোবরা)। এজন্য আমি চবি ও জোবরার কাছে কৃতজ্ঞ। এটা করে যে কোনোদিন একটা নোবেল পুরস্কার পাওয়া যাবে, কখনও মনে আসেনি। তবে লোকজন বলাবলি করেছিল মাঝে মাঝে।
সমাবর্তীদের উদ্দেশে ড. ইউনূস বলেন, সমাবর্তন একজন মানুষের জীবনে একটি মস্তবড় ঘটনা। সনদ নেবে, ছবিটি সংরক্ষণ করবে, সেটা সবাইকে দেখায়, সেই বিশেষ দিনটি আজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা কত তাড়াতাড়ি চলে যায়, কেটে যায় বোঝা যায় না। যখন শেষ হয়ে যায়, তখন মনে বড় কষ্ট লাগে। জীবনের একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো, নতুন অধ্যায়ের শুরু।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইয়াহ্ইয়া আখতারের সভাপতিত্বে এতে শিক্ষা উপদেষ্টা সি. আর আবরার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফয়েজ বক্তব্য দেন। 
আপনার মতামত লিখুন