ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি এবং উর্দুর প্রভাব আরোপ করা হয়। ফলে স্থানীয় ভাষাগুলো উপেক্ষিত হতে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে বহু ইউরোপীয় গবেষক ভারতীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও বিকাশ নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জন বিম্স (John Beames, 1837–1902)—যিনি শুধু ব্রিটিশ প্রশাসক নন, একজন ভাষাবিদ, গবেষক ও ইতিহাসবিদ। বাংলা ভাষার কাঠামো, সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক ব্যবহারের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জন বিম্স ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে কর্মরত অবস্থায় দীর্ঘ সময় বাংলায়, বিহার ও উড়িষ্যায় দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অন্বেষণ করেন।
তিনি মনে করতেন—
শিক্ষা ও সভ্যতায় অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলা প্রদেশ অন্য প্রদেশের তুলনায় এগিয়ে,
এবং বাংলা সাহিত্য ইতোমধ্যে ইউরোপীয় সাহিত্যের সমমানের উৎকর্ষ লাভ করতে শুরু করেছে।
সেই কারণেই তিনি বাংলা ভাষাকে প্রণালীবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ ও সাহিত্যে প্রমিত রূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জন বিম্স লক্ষ্য করেছিলেন যে বাংলা ভাষাচর্চায় দুইটি চরমপন্থী ধারা ছিল—
সংস্কৃতনির্ভর শব্দের আধিক্য: অনেকে অতিরিক্ত সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করে ভাষাকে দুর্বোধ্য ও সাধারণের অগম্য করে তুলছিলেন।
অতিরিক্ত স্থানীয় শব্দ: অপরদিকে, অনেকে অত্যন্ত চলিত, আঞ্চলিক এবং অসৌন্দর্যময় শব্দ ব্যবহার করে সাহিত্যিক শৈলী যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ করছিলেন।
বিম্সের বক্তব্য—
বাংলা ভাষাকে একদিকে অতি সংস্কৃতনির্ভর বা কঠিন না করা উচিত, আবার অপরদিকে কর্কশ ও অশুদ্ধ কথ্য শব্দ সাহিত্যে গ্রহণ করা যায় না।
অর্থাৎ তিনি সহজ, সুন্দর ও প্রমিত রূপের বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন।
বিম্স মনে করতেন—
বাংলায় এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত সাহিত্যিক নেই, যার ভাষা ও নিয়ম সবার জন্য প্রমিত রূপ হিসেবে গৃহীত হতে পারে।
পাঠ্যপুস্তকেরও তেমন উন্নতি হয়নি যে সেগুলো থেকে মান্যব্যাকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব।
তাই তাঁর প্রস্তাব—
✅ বাংলার সকল বিদ্বান, সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের সমন্বয়ে একটি ভাষা-সভা বা একাডেমি গঠন করতে হবে।
✅ সেই একাডেমি প্রমিত লিখিত ভাষা ও ব্যাকরণের ভিত্তি স্থির করবে।
✅ প্রতিষ্ঠানগত সহায়তায় বাংলা সাহিত্য ও ভাষার স্থিরতা নিশ্চিত হবে।
আজকের বাংলা একাডেমির ধারণা প্রকৃতপক্ষে বিম্সের চিন্তারই ধারাবাহিকতা।
যে জাতি নিজের ভাষাকে স্বীকৃতি দেয় না, তার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্পূর্ণ হতে পারে না—বিম্স এই তত্ত্ব সামনে আনেন।
প্রশাসন ও শিক্ষায় মাতৃভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করা জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ সহজ করবে—এ কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেন।
তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ “Comparative Grammar of the Modern Aryan Languages of India” (১৮৭২–১৮৭৯)।
এতে তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, আসামি ইত্যাদি ভাষাকে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করেন।
তিনি প্রমাণ করেন—বাংলা ব্যাকরণসমৃদ্ধ, সাহিত্যোপযোগী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা।
বাংলা শুধু কথ্য ভাষা নয়; ধর্ম, কাব্য, সংগীত, ইতিহাস, দর্শন—সকল ক্ষেত্রে এর শক্তিশালী প্রয়োগ আছে।
তিনি বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
আদালত, সরকারী দপ্তর ও বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুপারিশ করেন।
এতে জনগণ শিক্ষা ও আইনের কাছাকাছি আসবে।
✅ বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোচনায় নিয়ে যান
✅ বাংলা ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী মাতৃভাষা-নীতিতে বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি করেন
✅ বাংলা যে কেবল আঞ্চলিক ভাষা নয়, জাতিসত্তার বাহক—এটি প্রতিষ্ঠা করেন
জন বিম্স একজন ব্রিটিশ প্রশাসক হয়েও বাংলা ভাষার প্রকৃত বন্ধু ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেন—বাংলা একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, সাহিত্যসমৃদ্ধ ও আধুনিক ভাষা। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—
জনগণের উন্নয়ন চাইলে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রশাসন ও জ্ঞানচর্চা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
বাংলা ভাষার মান নির্ধারণ, সাহিত্যিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় জন বিম্সের অবদান আজও স্মরণীয়।

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫
ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি এবং উর্দুর প্রভাব আরোপ করা হয়। ফলে স্থানীয় ভাষাগুলো উপেক্ষিত হতে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে বহু ইউরোপীয় গবেষক ভারতীয় ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও বিকাশ নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জন বিম্স (John Beames, 1837–1902)—যিনি শুধু ব্রিটিশ প্রশাসক নন, একজন ভাষাবিদ, গবেষক ও ইতিহাসবিদ। বাংলা ভাষার কাঠামো, সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক ব্যবহারের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জন বিম্স ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে কর্মরত অবস্থায় দীর্ঘ সময় বাংলায়, বিহার ও উড়িষ্যায় দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অন্বেষণ করেন।
তিনি মনে করতেন—
শিক্ষা ও সভ্যতায় অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলা প্রদেশ অন্য প্রদেশের তুলনায় এগিয়ে,
এবং বাংলা সাহিত্য ইতোমধ্যে ইউরোপীয় সাহিত্যের সমমানের উৎকর্ষ লাভ করতে শুরু করেছে।
সেই কারণেই তিনি বাংলা ভাষাকে প্রণালীবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ ও সাহিত্যে প্রমিত রূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
জন বিম্স লক্ষ্য করেছিলেন যে বাংলা ভাষাচর্চায় দুইটি চরমপন্থী ধারা ছিল—
সংস্কৃতনির্ভর শব্দের আধিক্য: অনেকে অতিরিক্ত সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করে ভাষাকে দুর্বোধ্য ও সাধারণের অগম্য করে তুলছিলেন।
অতিরিক্ত স্থানীয় শব্দ: অপরদিকে, অনেকে অত্যন্ত চলিত, আঞ্চলিক এবং অসৌন্দর্যময় শব্দ ব্যবহার করে সাহিত্যিক শৈলী যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ করছিলেন।
বিম্সের বক্তব্য—
বাংলা ভাষাকে একদিকে অতি সংস্কৃতনির্ভর বা কঠিন না করা উচিত, আবার অপরদিকে কর্কশ ও অশুদ্ধ কথ্য শব্দ সাহিত্যে গ্রহণ করা যায় না।
অর্থাৎ তিনি সহজ, সুন্দর ও প্রমিত রূপের বাংলা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন।
বিম্স মনে করতেন—
বাংলায় এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত সাহিত্যিক নেই, যার ভাষা ও নিয়ম সবার জন্য প্রমিত রূপ হিসেবে গৃহীত হতে পারে।
পাঠ্যপুস্তকেরও তেমন উন্নতি হয়নি যে সেগুলো থেকে মান্যব্যাকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব।
তাই তাঁর প্রস্তাব—
✅ বাংলার সকল বিদ্বান, সাহিত্যিক ও ভাষাবিদদের সমন্বয়ে একটি ভাষা-সভা বা একাডেমি গঠন করতে হবে।
✅ সেই একাডেমি প্রমিত লিখিত ভাষা ও ব্যাকরণের ভিত্তি স্থির করবে।
✅ প্রতিষ্ঠানগত সহায়তায় বাংলা সাহিত্য ও ভাষার স্থিরতা নিশ্চিত হবে।
আজকের বাংলা একাডেমির ধারণা প্রকৃতপক্ষে বিম্সের চিন্তারই ধারাবাহিকতা।
যে জাতি নিজের ভাষাকে স্বীকৃতি দেয় না, তার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্পূর্ণ হতে পারে না—বিম্স এই তত্ত্ব সামনে আনেন।
প্রশাসন ও শিক্ষায় মাতৃভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করা জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ সহজ করবে—এ কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেন।
তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ “Comparative Grammar of the Modern Aryan Languages of India” (১৮৭২–১৮৭৯)।
এতে তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, আসামি ইত্যাদি ভাষাকে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করেন।
তিনি প্রমাণ করেন—বাংলা ব্যাকরণসমৃদ্ধ, সাহিত্যোপযোগী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা।
বাংলা শুধু কথ্য ভাষা নয়; ধর্ম, কাব্য, সংগীত, ইতিহাস, দর্শন—সকল ক্ষেত্রে এর শক্তিশালী প্রয়োগ আছে।
তিনি বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
আদালত, সরকারী দপ্তর ও বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুপারিশ করেন।
এতে জনগণ শিক্ষা ও আইনের কাছাকাছি আসবে।
✅ বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোচনায় নিয়ে যান
✅ বাংলা ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী মাতৃভাষা-নীতিতে বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি করেন
✅ বাংলা যে কেবল আঞ্চলিক ভাষা নয়, জাতিসত্তার বাহক—এটি প্রতিষ্ঠা করেন
জন বিম্স একজন ব্রিটিশ প্রশাসক হয়েও বাংলা ভাষার প্রকৃত বন্ধু ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেন—বাংলা একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, সাহিত্যসমৃদ্ধ ও আধুনিক ভাষা। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—
জনগণের উন্নয়ন চাইলে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রশাসন ও জ্ঞানচর্চা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
বাংলা ভাষার মান নির্ধারণ, সাহিত্যিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠায় জন বিম্সের অবদান আজও স্মরণীয়।

আপনার মতামত লিখুন