নজর বিডি
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাস: যেভাবে এলো নামগুলো

হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাস: যেভাবে এলো নামগুলো

হিজরি সন বা ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসের নামের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, আরবদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য। চান্দ্রবর্ষের ঘূর্ণনশীল নিয়মের কারণে ঋতু পরিবর্তন হলেও এই নামগুলো এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। 

একই সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান পালনে এই বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব অপরিসীম।

আরবদের প্রাচীন ঋতু, জলবায়ু এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মুহাররম (المحرم)

এই মাসে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা ‘হারাম’ ছিল বলে এর নাম রাখা হয়েছে মুহাররম। মুফাসসিরদের মতে, পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে যে চারটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাসের কথা বলা হয়েছে, মুহাররম তার অন্যতম।

২. সফর (صفر)

সফর শব্দের অর্থ শূন্য বা খালি। প্রাচীন আরবরা যখন যুদ্ধের জন্য মক্কা ছেড়ে চলে যেত, তখন তাদের ঘরবাড়ি একদম জনশূন্য বা খালি হয়ে পড়ত। এই জনমানবহীন শূন্যতা থেকেই মাসটির নাম হয়েছে সফর।

৩. রবিউল আউয়াল (ربيع الأول)

হিজরি ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করার সময় এই মাসটি পড়েছিল চমৎকার বসন্ত ঋতুতে। আরবিতে ‘রবি’ শব্দের অর্থ বসন্ত। প্রথম বসন্তের মাস হিসেবে এর নাম রাখা হয় রবিউল আউয়াল।

৪. রবিউস সানি (ربيع الثاني)

রবিউল আউয়ালের মতো এই মাসটিও তৎকালীন সময়ে বসন্ত ঋতুতেই পড়েছিল। এর ঠিক পর পরই এর অবস্থান হওয়ায় একে রবিউস সানি বা দ্বিতীয় বসন্তের মাস বলা হয়।

৫. জমাদিউল আউয়াল (جمادى الأولى)

নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি এসেছিল তীব্র শীতের মৌসুমে। সে সময় শীতের প্রকোপে পানি জমে বরফ হয়ে যেত। আরবি ‘জামাদ’ বা ‘জুমাদা’ শব্দের অর্থ জমে যাওয়া। সেই জমাট বাঁধা শীতের প্রথম মাস হিসেবে এর এই নামকরণ।

৬. জমাদিউস সানি (جمادى الآخرة)

এটিও শীতেরই মাস এবং জমাদিউল আউয়ালের ঠিক পরেই এর অবস্থান। শীতের তীব্রতায় পানি জমে যাওয়ার দ্বিতীয় মাস হিসেবে একে জমাদিউস সানি বলা হয়।

৭. রজব (রجب)

এটিও একটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাস। প্রাচীন আরবরা এই মাসে যুদ্ধের সব ধরনের প্রস্তুতি বন্ধ রাখত, এমনকি বল্লমের মাথা থেকে ধারালো ফলা বা নাল খুলে রাখত। এই বিশেষ সম্মান ও যুদ্ধবিরতি থেকেই এর নাম রাখা হয়েছে রজব।

৮. শাবান (شعبان)

এই মাসের নামকরণের পেছনে দুটি মত রয়েছে। কেউ বলেন, তীব্র গরমে পানির সন্ধানে আরবরা এই মাসে চারিদিকে ছড়িয়ে (আরবিতে ‘তাশায়উব’) বা বিভক্ত হয়ে পড়ত। আবার কারো মতে, পবিত্র রজব মাসে যুদ্ধ বন্ধ থাকার পর এই মাস শুরু হতেই আরবরা আবার যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মাঠে নামত।

৯. রমজান (رمضان)

রমজান শব্দটি এসেছে ‘রমদা’ থেকে, যার অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ বা তীব্র গরম। মাসগুলোর নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পড়েছিল। ইসলাম আগমনের পর এই পবিত্র মাসেই মুসলমানদের জন্য সিয়াম বা রোজা পালন ফরজ করা হয়।

১০. শাওয়াল (شوال)

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এই মাসেই উদযাপিত হয়। আরবরা লক্ষ্য করেছিল, এই সময়ে উটের দুধ শুকিয়ে যেত এবং ওজনে কম হতো। উটের দুধ কমে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে আরবিতে ‘শওলান’ বলা হতো, যা থেকে পরবর্তীতে শাওয়াল নামের উৎপত্তি।

১১. জিলকদ (ذو القعدة)

এটি ইসলামের চার পবিত্র ও যুদ্ধনিষিদ্ধ মাসের প্রথম মাস। এই মাসে আরবরা যুদ্ধবিগ্রহ, ভ্রমণ ও দূরদূরান্তে যাতায়াত বন্ধ করে ঘরে বসে থাকত বা শান্ত হয়ে থিতু হতো। এই বসে থাকা (‘কাআদা’) বা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা থেকেই মাসটির নাম রাখা হয় জিলকদ।

১২. জিলহজ (ذو الحجة)

ইসলামপূর্ব যুগেও আরবরা এই মাসে পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত বা হজ করতে যেত। হজের মাস হওয়ার কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে জিলহজ।

ইসলামি শরিয়তের বহু গুরুত্বপূর্ণ হুকুম-আহকাম হিজরি সনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল:

বিবাহবিচ্ছেদের পর বা স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীর ইদ্দতের দিন গণনা করা হয় এই হিজরি বা চান্দ্রবর্ষের হিসাবে।

ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার হিসাবটিও হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করতে হয়।

পবিত্র রমজানের রোজা, হজের নির্দিষ্ট সময়, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং পবিত্র আশুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন ও উৎসবগুলো নির্ধারণে হিজরি সনই একমাত্র ভিত্তি।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ হিজরি সন, ইসলামি বর্ষপঞ্জি, হিজরি ১২ মাস, মুহাররম, রমজান, জিলহজ, হিজরি মাসের ইতিহাস, ইসলামি শরিয়ত, ধর্ম বিষয়ক সংবাদ Hijri Calendar, Islamic Months History, Hijri 12 Months, Muharram, Ramadan, Dhul Hijjah, Islamic Year, Shariah Law, Religious News

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাস: যেভাবে এলো নামগুলো

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

হিজরি সন বা ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি মাসের নামের পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস, আরবদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য। চান্দ্রবর্ষের ঘূর্ণনশীল নিয়মের কারণে ঋতু পরিবর্তন হলেও এই নামগুলো এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। 

একই সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান পালনে এই বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব অপরিসীম।

আরবদের প্রাচীন ঋতু, জলবায়ু এবং সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে হিজরি ১২ মাসের নামকরণের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মুহাররম (المحرم)

এই মাসে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা ‘হারাম’ ছিল বলে এর নাম রাখা হয়েছে মুহাররম। মুফাসসিরদের মতে, পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে যে চারটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাসের কথা বলা হয়েছে, মুহাররম তার অন্যতম।

২. সফর (صفر)

সফর শব্দের অর্থ শূন্য বা খালি। প্রাচীন আরবরা যখন যুদ্ধের জন্য মক্কা ছেড়ে চলে যেত, তখন তাদের ঘরবাড়ি একদম জনশূন্য বা খালি হয়ে পড়ত। এই জনমানবহীন শূন্যতা থেকেই মাসটির নাম হয়েছে সফর।

৩. রবিউল আউয়াল (ربيع الأول)

হিজরি ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করার সময় এই মাসটি পড়েছিল চমৎকার বসন্ত ঋতুতে। আরবিতে ‘রবি’ শব্দের অর্থ বসন্ত। প্রথম বসন্তের মাস হিসেবে এর নাম রাখা হয় রবিউল আউয়াল।

৪. রবিউস সানি (ربيع الثاني)

রবিউল আউয়ালের মতো এই মাসটিও তৎকালীন সময়ে বসন্ত ঋতুতেই পড়েছিল। এর ঠিক পর পরই এর অবস্থান হওয়ায় একে রবিউস সানি বা দ্বিতীয় বসন্তের মাস বলা হয়।

৫. জমাদিউল আউয়াল (جمادى الأولى)

নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি এসেছিল তীব্র শীতের মৌসুমে। সে সময় শীতের প্রকোপে পানি জমে বরফ হয়ে যেত। আরবি ‘জামাদ’ বা ‘জুমাদা’ শব্দের অর্থ জমে যাওয়া। সেই জমাট বাঁধা শীতের প্রথম মাস হিসেবে এর এই নামকরণ।

৬. জমাদিউস সানি (جمادى الآخرة)

এটিও শীতেরই মাস এবং জমাদিউল আউয়ালের ঠিক পরেই এর অবস্থান। শীতের তীব্রতায় পানি জমে যাওয়ার দ্বিতীয় মাস হিসেবে একে জমাদিউস সানি বলা হয়।

৭. রজব (রجب)

এটিও একটি যুদ্ধনিষিদ্ধ পবিত্র মাস। প্রাচীন আরবরা এই মাসে যুদ্ধের সব ধরনের প্রস্তুতি বন্ধ রাখত, এমনকি বল্লমের মাথা থেকে ধারালো ফলা বা নাল খুলে রাখত। এই বিশেষ সম্মান ও যুদ্ধবিরতি থেকেই এর নাম রাখা হয়েছে রজব।

৮. শাবান (شعبان)

এই মাসের নামকরণের পেছনে দুটি মত রয়েছে। কেউ বলেন, তীব্র গরমে পানির সন্ধানে আরবরা এই মাসে চারিদিকে ছড়িয়ে (আরবিতে ‘তাশায়উব’) বা বিভক্ত হয়ে পড়ত। আবার কারো মতে, পবিত্র রজব মাসে যুদ্ধ বন্ধ থাকার পর এই মাস শুরু হতেই আরবরা আবার যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মাঠে নামত।

৯. রমজান (رمضان)

রমজান শব্দটি এসেছে ‘রমদা’ থেকে, যার অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ বা তীব্র গরম। মাসগুলোর নাম নির্ধারণের সময় এই মাসটি প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পড়েছিল। ইসলাম আগমনের পর এই পবিত্র মাসেই মুসলমানদের জন্য সিয়াম বা রোজা পালন ফরজ করা হয়।

১০. শাওয়াল (شوال)

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এই মাসেই উদযাপিত হয়। আরবরা লক্ষ্য করেছিল, এই সময়ে উটের দুধ শুকিয়ে যেত এবং ওজনে কম হতো। উটের দুধ কমে যাওয়া বা শুকিয়ে যাওয়ার এই অবস্থাকে আরবিতে ‘শওলান’ বলা হতো, যা থেকে পরবর্তীতে শাওয়াল নামের উৎপত্তি।

১১. জিলকদ (ذو القعدة)

এটি ইসলামের চার পবিত্র ও যুদ্ধনিষিদ্ধ মাসের প্রথম মাস। এই মাসে আরবরা যুদ্ধবিগ্রহ, ভ্রমণ ও দূরদূরান্তে যাতায়াত বন্ধ করে ঘরে বসে থাকত বা শান্ত হয়ে থিতু হতো। এই বসে থাকা (‘কাআদা’) বা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা থেকেই মাসটির নাম রাখা হয় জিলকদ।

১২. জিলহজ (ذو الحجة)

ইসলামপূর্ব যুগেও আরবরা এই মাসে পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত বা হজ করতে যেত। হজের মাস হওয়ার কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে জিলহজ।

ইসলামি শরিয়তের বহু গুরুত্বপূর্ণ হুকুম-আহকাম হিজরি সনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল:

বিবাহবিচ্ছেদের পর বা স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীর ইদ্দতের দিন গণনা করা হয় এই হিজরি বা চান্দ্রবর্ষের হিসাবে।

ধনীদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার হিসাবটিও হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করতে হয়।

পবিত্র রমজানের রোজা, হজের নির্দিষ্ট সময়, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং পবিত্র আশুরার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন ও উৎসবগুলো নির্ধারণে হিজরি সনই একমাত্র ভিত্তি।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত