গত ১৫ জুন, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও আপিল সভার সিদ্ধান্তসমূহ কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং তা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির এক গভীর সংকটের স্মারক।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত সহিংসতার দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জন্য যে দণ্ড ও আপিল মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) তাত্ত্বিক নিরিখে এক গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
আপাতদৃষ্টিতে একে বিচারিক প্রক্রিয়া মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে এটি মূলত 'প্রতীকী শাস্তি'র (Symbolic Punishment) মোড়কে জনক্ষোভ প্রশমিত করার এবং অপরাধী চক্রকে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি দায়বদ্ধতা থেকে এক ধরনের প্রশাসনিক সুরক্ষাকবচ দেওয়ার চতুর প্রয়াস। এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এক নেতিবাচক সমঝোতার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো অপরাধের দণ্ড হতে হবে অপরাধের গুরুত্ব, অভিঘাত ও মাত্রার সাথে সম্পূর্ণ আনুপাতিক (Proportional)। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত হামলা, উস্কানি এবং দমনপীড়ন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ বা চাকুরিকালীন অসদাচরণ ছিল না। এটি ছিল মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের রায়ে বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি কিংবা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলের মতো যে সমস্ত দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, অপরাধতাত্ত্বে তাকে "প্রতীকী শাস্তি" হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ ধরনের দণ্ডের নেপথ্য মনস্তত্ত্ব হলো অপরাধের মূল গুরুত্বকে লঘু করা (Trivialization) এবং অভিযুক্তদের সামাজিক ও আইনিভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার পথ সুগম করা। মূল কুশীলবদের মূল বেতন স্কেলে নামিয়ে আনা বা সাময়িক প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা করার মাধ্যমে তাদের মূল অপরাধের গুরুত্বকে এক প্রকার আড়াল করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অন্তরায়।
এই প্রশাসনিক ভাগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উন্মোচিত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাঠপর্যায়ে দমন-পীড়নে জড়িত ব্যক্তিদের অপরাধের বিচারিক ফ্রেমিং ও আপিল সিদ্ধান্তে। অপরাধবিজ্ঞানের "অর্গানাইজড ক্রাইম" বা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সূত্র অনুযায়ী, উস্কানিদাতা এবং প্রত্যক্ষ বাস্তবায়নকারী উভয়ই সমভাবে দায়ী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-র সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এই সংকটের দিকে আলো তুলেছে। জাকসু নেতৃবৃন্দের মতে, administrations-এর এই আপিল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নে অভিযুক্তদের পূর্বে ঘোষিত শাস্তি হ্রাস, পরিবর্তন ও আংশিক অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই "শাস্তির পুনর্বিন্যাস" এবং নম্রতা প্রদর্শন ন্যায়বিচারের চেতনাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে।
কোনো আপিল প্রক্রিয়া তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন তা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কিন্তু কোন তথ্য-প্রমাণ, কী মানদণ্ড এবং কোন যুক্তির ভিত্তিতে এই আপিল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের কাছে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের গভীর আস্থাহীনতায় রূপ নিয়েছে, যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের সুরক্ষার এক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক রাজনীতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে এক ধরণের সুবিধাবাদ এবং আদেশহীনতার ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হচ্ছে। ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তিত হলেও পারস্পরিক সুরক্ষার যে অলিখিত মৈত্রীচুক্তি (Collusion), তা সব সময়ই অপরিবর্তিত থেকে যায়।
যখনই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন আসে, তখনই এক ধরণের কৌশলগত আপোষের সংস্কৃতি তৈরি হয়। বর্তমান প্রশাসনের অনেকেই অতীতে ভিন্ন অবয়বে পূর্ববর্তী নীতিমালার সুবিধাভোগী ছিলেন। ফলে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বা দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির খতিয়ান পুনরায় জনসমক্ষে চলে আসার আশঙ্কা থাকে। এই পারস্পরিক ভীতি ও সমঝোতার কারণেই প্রশাসন অনেক সময় দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান নিতে দ্বিধাবোধ করে, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের মূল দায়িত্ব হলো ক্যাম্পাসে পরিপূর্ণ পরিবেশ, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা। গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত একটি প্রশাসনের কাছ থেকে সাধারণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা যে আপসহীন ও "জিরো টলারেন্স" নীতি আশা করেছিল, বর্তমান প্রশাসনের এই আপোষকামী সিদ্ধান্ত তার সাথে এক ধরণের বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও নামকাওয়াস্তে শাস্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে খর্ব করা হয়েছে। যে শিক্ষকরা সরাসরি সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন কিংবা শান্তি বিঘ্নিত করার পথ সুগম করেছেন, তারা যখন দৃশ্যমান কোনো কঠোর ফৌজদারি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না হয়ে নামমাত্র প্রশাসনিক সাজার আওতায় থাকেন, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়।
১৫ জুন, ২০২৬-এর সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্তদের দণ্ড এবং অব্যাহতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্র. | নাম ও পদবি | বিভাগের নাম | সিন্ডিকেট কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি |
| ১ | মেহেদী ইকবাল (সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | ভূগোল ও পরিবেশ | বাধ্যতামূলক অবসর। |
| ২ | মহিবুর রৌফ শৈবাল (সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | নাটক ও নাট্যত্ত্ব | সহকারী অধ্যাপক পদ থেকে প্রভাষক পদে পদাবনতি। |
| ৩ | মোস্তফা ফিরোজ (অধ্যাপক ও সাবেক প্রো-ভিসি) | প্রাণিবিদ্যা | গ্রেড-২ তে পদাবনতি। |
| ৪ | তাজউদ্দীন সিকদার (অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৫ | বশির আহমেদ (অধ্যাপক ও সাবেক ডিন) | সরকার ও রাজনীতি | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৬ | আ. স. ম ফিরোজ-উল-হাসান (অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর) | সরকার ও রাজনীতি | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৭ | আলমগীর কবীর (অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর) | পরিসংখ্যান | আগামী ৫ বছর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন নিষিদ্ধ, বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নামানো। |
| ৮ | ইসরাফিল আহমেদ (অধ্যাপক) | নাটক ও নাট্যতত্ত্ব | বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। |
| ৯ | নাজমুল হোসেন তালুকদার (অধ্যাপক) | বাংলা | দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলসহ নিম্নতর বেতনস্তর নির্ধারণ। |
| ১০ | কানন কুমার সেন (প্রভাষক) | অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস | দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল। |
| ১১ | এ এ মামুন (অধ্যাপক ও সাবেক শিক্ষক সমিতির সভাপতি) | পদার্থবিজ্ঞান | সতর্কীকরণের পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ১২ | নাহিদুর রহমান খান (ডেপুটি রেজিস্ট্রার) | প্রশাসনিক শাখা | ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদ থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি (২ বছর পর পুনরায় আবেদনের সুযোগসহ)। |
তদন্তে সুস্পষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের গুঞ্জন থাকা সত্ত্বেও নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গকে সমস্ত অভিযোগের দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে:
১. অধ্যাপক মো. নুরুল আলম (তৎকালীন উপাচার্য)
২. অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম (তৎকালীন সহ-উপাচার্য-প্রশাসন)
৩. অধ্যাপক রাশেদ আখতার (তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ)
সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের সাথে সাথেই সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। জাকসু সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলামের বক্তব্য এই রায়ের অসারতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে:
"গণ-অভ্যুত্থানের ২০ মাস পর জুলাই হামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচারের রায়ে প্রশাসন আবারও প্রমাণ করলো তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, জুলাই শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে।"
জাকসু’র আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এর ফলে ক্যাম্পাসে এক ধরণের 'দায়মুক্তির সংস্কৃতি' আরও উৎসাহিত হবে। ছাত্রসমাজ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই বিষয়ে কঠোর ও সোচ্চার অবস্থানে থাকবে। ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষীয় তদন্ত বা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে—যেখানে দেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠ নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং আইনি বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রশাসনিক সাজার গণ্ডি পেরিয়ে যেসকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতায় সরাসরি সম্পৃক্ততা, অস্ত্র ব্যবহার বা উস্কানির প্রমাণ মিলেছে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির আওতায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, আপিল সভার পর্যালোচনার ভিত্তি এবং অপরাধ সংক্রান্ত প্রাপ্ত মেটাডাটা (ভিডিও, অ디오 ও ছবি) পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী প্রশাসনিক সমঝোতার অন্ধকার গলির সুযোগ না পায়।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় এবং সাক্ষ্যদানে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রাতিষ্ঠানিক বা political হয়রানি থেকে বাঁচাতে কঠোর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আপোষকামী রায় মূলত উচ্চশিক্ষার সেই ক্ষয়ে যাওয়া প্রশাসনিক ও নৈতিক কাঠামোকে নির্দেশ করে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে কৌশলগত পিঠ বাঁচানোর নীতিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ করলেও, প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব দিনশেষে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে অপরাধীদের এক ধরণের ছায়া প্রদান করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক পুনর্গঠন ও সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক নতুন ও অনিবার্য অধ্যায়ের সূচনা।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাবি সিন্ডিকেট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, প্রতীকী শাস্তি, জাকসু, জাবি উপাচার্য, অপরাধবিজ্ঞান, আসিফ মিজান, উচ্চশিক্ষা সংকট, দায়মুক্তির সংস্কৃতি, শিক্ষা কলাম, জাবি সংবাদ Jahangirnagar University, JU Syndicate Decision, July Uprising, Symbolic Punishment, JAKSU, JU Vice Chancellor, Criminology Analysis, Asif Mizan, University Politics, Impunity Culture, JU News, Bangladesh Education

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
গত ১৫ জুন, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও আপিল সভার সিদ্ধান্তসমূহ কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং তা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির এক গভীর সংকটের স্মারক।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত সহিংসতার দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জন্য যে দণ্ড ও আপিল মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) তাত্ত্বিক নিরিখে এক গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
আপাতদৃষ্টিতে একে বিচারিক প্রক্রিয়া মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে এটি মূলত 'প্রতীকী শাস্তি'র (Symbolic Punishment) মোড়কে জনক্ষোভ প্রশমিত করার এবং অপরাধী চক্রকে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি দায়বদ্ধতা থেকে এক ধরনের প্রশাসনিক সুরক্ষাকবচ দেওয়ার চতুর প্রয়াস। এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এক নেতিবাচক সমঝোতার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো অপরাধের দণ্ড হতে হবে অপরাধের গুরুত্ব, অভিঘাত ও মাত্রার সাথে সম্পূর্ণ আনুপাতিক (Proportional)। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত হামলা, উস্কানি এবং দমনপীড়ন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ বা চাকুরিকালীন অসদাচরণ ছিল না। এটি ছিল মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ।
অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের রায়ে বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি কিংবা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলের মতো যে সমস্ত দণ্ড প্রদান করা হয়েছে, অপরাধতাত্ত্বে তাকে "প্রতীকী শাস্তি" হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ ধরনের দণ্ডের নেপথ্য মনস্তত্ত্ব হলো অপরাধের মূল গুরুত্বকে লঘু করা (Trivialization) এবং অভিযুক্তদের সামাজিক ও আইনিভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার পথ সুগম করা। মূল কুশীলবদের মূল বেতন স্কেলে নামিয়ে আনা বা সাময়িক প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা করার মাধ্যমে তাদের মূল অপরাধের গুরুত্বকে এক প্রকার আড়াল করা হয়েছে, যা প্রকারান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অন্তরায়।
এই প্রশাসনিক ভাগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি উন্মোচিত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাঠপর্যায়ে দমন-পীড়নে জড়িত ব্যক্তিদের অপরাধের বিচারিক ফ্রেমিং ও আপিল সিদ্ধান্তে। অপরাধবিজ্ঞানের "অর্গানাইজড ক্রাইম" বা প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সূত্র অনুযায়ী, উস্কানিদাতা এবং প্রত্যক্ষ বাস্তবায়নকারী উভয়ই সমভাবে দায়ী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-র সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে এই সংকটের দিকে আলো তুলেছে। জাকসু নেতৃবৃন্দের মতে, administrations-এর এই আপিল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নিপীড়নে অভিযুক্তদের পূর্বে ঘোষিত শাস্তি হ্রাস, পরিবর্তন ও আংশিক অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এই "শাস্তির পুনর্বিন্যাস" এবং নম্রতা প্রদর্শন ন্যায়বিচারের চেতনাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে।
কোনো আপিল প্রক্রিয়া তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন তা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কিন্তু কোন তথ্য-প্রমাণ, কী মানদণ্ড এবং কোন যুক্তির ভিত্তিতে এই আপিল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের কাছে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি এক ধরনের গভীর আস্থাহীনতায় রূপ নিয়েছে, যা প্রকারান্তরে অপরাধীদের সুরক্ষার এক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক রাজনীতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে এক ধরণের সুবিধাবাদ এবং আদেশহীনতার ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হচ্ছে। ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তিত হলেও পারস্পরিক সুরক্ষার যে অলিখিত মৈত্রীচুক্তি (Collusion), তা সব সময়ই অপরিবর্তিত থেকে যায়।
যখনই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন আসে, তখনই এক ধরণের কৌশলগত আপোষের সংস্কৃতি তৈরি হয়। বর্তমান প্রশাসনের অনেকেই অতীতে ভিন্ন অবয়বে পূর্ববর্তী নীতিমালার সুবিধাভোগী ছিলেন। ফলে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বা দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির খতিয়ান পুনরায় জনসমক্ষে চলে আসার আশঙ্কা থাকে। এই পারস্পরিক ভীতি ও সমঝোতার কারণেই প্রশাসন অনেক সময় দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান নিতে দ্বিধাবোধ করে, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে উপাচার্যের মূল দায়িত্ব হলো ক্যাম্পাসে পরিপূর্ণ পরিবেশ, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা। গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত একটি প্রশাসনের কাছ থেকে সাধারণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা যে আপসহীন ও "জিরো টলারেন্স" নীতি আশা করেছিল, বর্তমান প্রশাসনের এই আপোষকামী সিদ্ধান্ত তার সাথে এক ধরণের বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও নামকাওয়াস্তে শাস্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে খর্ব করা হয়েছে। যে শিক্ষকরা সরাসরি সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন কিংবা শান্তি বিঘ্নিত করার পথ সুগম করেছেন, তারা যখন দৃশ্যমান কোনো কঠোর ফৌজদারি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না হয়ে নামমাত্র প্রশাসনিক সাজার আওতায় থাকেন, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়।
১৫ জুন, ২০২৬-এর সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্তদের দণ্ড এবং অব্যাহতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্র. | নাম ও পদবি | বিভাগের নাম | সিন্ডিকেট কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি |
| ১ | মেহেদী ইকবাল (সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | ভূগোল ও পরিবেশ | বাধ্যতামূলক অবসর। |
| ২ | মহিবুর রৌফ শৈবাল (সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | নাটক ও নাট্যত্ত্ব | সহকারী অধ্যাপক পদ থেকে প্রভাষক পদে পদাবনতি। |
| ৩ | মোস্তফা ফিরোজ (অধ্যাপক ও সাবেক প্রো-ভিসি) | প্রাণিবিদ্যা | গ্রেড-২ তে পদাবনতি। |
| ৪ | তাজউদ্দীন সিকদার (অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর) | পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৫ | বশির আহমেদ (অধ্যাপক ও সাবেক ডিন) | সরকার ও রাজনীতি | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৬ | আ. স. ম ফিরোজ-উল-হাসান (অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর) | সরকার ও রাজনীতি | আগামী ২ বছরের জন্য প্রারম্ভিক স্কেল, ৫ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ৭ | আলমগীর কবীর (অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর) | পরিসংখ্যান | আগামী ৫ বছর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন নিষিদ্ধ, বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নামানো। |
| ৮ | ইসরাফিল আহমেদ (অধ্যাপক) | নাটক ও নাট্যতত্ত্ব | বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। |
| ৯ | নাজমুল হোসেন তালুকদার (অধ্যাপক) | বাংলা | দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিলসহ নিম্নতর বেতনস্তর নির্ধারণ। |
| ১০ | কানন কুমার সেন (প্রভাষক) | অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস | দুই বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাতিল। |
| ১১ | এ এ মামুন (অধ্যাপক ও সাবেক শিক্ষক সমিতির সভাপতি) | পদার্থবিজ্ঞান | সতর্কীকরণের পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্বে অযোগ্য ঘোষণা। |
| ১২ | নাহিদুর রহমান খান (ডেপুটি রেজিস্ট্রার) | প্রশাসনিক শাখা | ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদ থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি (২ বছর পর পুনরায় আবেদনের সুযোগসহ)। |
তদন্তে সুস্পষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের গুঞ্জন থাকা সত্ত্বেও নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গকে সমস্ত অভিযোগের দায় থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে:
১. অধ্যাপক মো. নুরুল আলম (তৎকালীন উপাচার্য)
২. অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম (তৎকালীন সহ-উপাচার্য-প্রশাসন)
৩. অধ্যাপক রাশেদ আখতার (তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ)
সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের সাথে সাথেই সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। জাকসু সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলামের বক্তব্য এই রায়ের অসারতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে:
"গণ-অভ্যুত্থানের ২০ মাস পর জুলাই হামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচারের রায়ে প্রশাসন আবারও প্রমাণ করলো তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, জুলাই শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে।"
জাকসু’র আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এর ফলে ক্যাম্পাসে এক ধরণের 'দায়মুক্তির সংস্কৃতি' আরও উৎসাহিত হবে। ছাত্রসমাজ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই বিষয়ে কঠোর ও সোচ্চার অবস্থানে থাকবে। ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে বর্তমান কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষীয় তদন্ত বা বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে—যেখানে দেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠ নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং আইনি বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রশাসনিক সাজার গণ্ডি পেরিয়ে যেসকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতায় সরাসরি সম্পৃক্ততা, অস্ত্র ব্যবহার বা উস্কানির প্রমাণ মিলেছে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির আওতায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, আপিল সভার পর্যালোচনার ভিত্তি এবং অপরাধ সংক্রান্ত প্রাপ্ত মেটাডাটা (ভিডিও, অ디오 ও ছবি) পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী প্রশাসনিক সমঝোতার অন্ধকার গলির সুযোগ না পায়।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় এবং সাক্ষ্যদানে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রাতিষ্ঠানিক বা political হয়রানি থেকে বাঁচাতে কঠোর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আপোষকামী রায় মূলত উচ্চশিক্ষার সেই ক্ষয়ে যাওয়া প্রশাসনিক ও নৈতিক কাঠামোকে নির্দেশ করে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে কৌশলগত পিঠ বাঁচানোর নীতিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়।
শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ করলেও, প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব দিনশেষে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে অপরাধীদের এক ধরণের ছায়া প্রদান করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক পুনর্গঠন ও সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এক নতুন ও অনিবার্য অধ্যায়ের সূচনা।

আপনার মতামত লিখুন