ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র (Islamabad Memorandum of Understanding) অংশ হিসেবে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকা থেকে সামরিক অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকোমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরানি বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক ও সাধারণ জাহাজের আসা-যাওয়া এবং চলাচলে আর কোনো বাধা দেবে না মার্কিন বাহিনী। এতদিন যেসব সামরিক অবরোধ জারি করা হয়েছিল, তার সবকটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।”
এর আগে, গত ১৭ জুন (বুধবার) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল ইরানের বন্দর ও সমুদ্র উপকূল থেকে মার্কিন সামরিক অবরোধ প্রত্যাহার। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিনের মাথাতেই সেই শর্ত কার্যকর করলো ওয়াশিংটন।
মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের পর এখন মূলত অপেক্ষা হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের অবরোধ তুলে নেওয়ার। তেহরানের পরমাণু প্রকল্প ঘিরে সৃষ্ট টানাপোড়েনের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার দিনই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে ইরান। শুধু তাই নয়, অবরোধ আরও জোরদার করতে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালির বিভিন্ন স্থানে জলমাইনও পেতে রাখে ইরানি বাহিনী—যা এখনও কার্যকর রয়েছে।
সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তেহরানের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে ইরানের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার কিংবা মাইন অপসারণ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা তথ্য আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অবশ্য আশাবাদী যে ইরান শিগগিরই হরমুজ ইস্যুতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান টানা দুই রাত হরমুজে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে কোনো ধরনের হামলা করা থেকে বিরত থেকেছে। এখন পর্যন্ত তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।"
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, এই দুই রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্য যাচাই করতে না পারলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে—গত ২ দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩টি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ চলাচল করেছে, যার সম্মিলিত তেলের পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ ব্যারেল।
বিশ্বের মোট জ্বালানিপণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয় এই কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই রুট দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৬০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস পরিবহন করা হতো।
ইরান এই প্রণালিতে অবরোধ জারি করার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর ব্যাঘাত ঘটে। ফলে একদিকে যেমন দেশে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেল ও গ্যাসের দাম।
জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার সিএনবিসিকে জানিয়েছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ এবং সৎভাবে মেনে চলে—তাহলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এবং যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় পৌঁছাতে কমপক্ষে আরও ২ মাস সময় লাগবে।
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ মার্কিন ইরান চুক্তি, ডোনাল্ড ট্রাম্প, মাসুদ পেজেশকিয়ান, হরমুজ প্রণালি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সেন্টকোম, বিশ্ববাজার তেল সংকট, ইসলামাবাদ সমঝোতা, আন্তর্জাতিক খবর US Iran Agreement, Donald Trump, Masoud Pezeshkian, Hormuz Strait Blockade, US CENTCOM, Oil Market Crisis, Islamabad MOU, International News Today

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র (Islamabad Memorandum of Understanding) অংশ হিসেবে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকা থেকে সামরিক অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকোমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরানি বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক ও সাধারণ জাহাজের আসা-যাওয়া এবং চলাচলে আর কোনো বাধা দেবে না মার্কিন বাহিনী। এতদিন যেসব সামরিক অবরোধ জারি করা হয়েছিল, তার সবকটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।”
এর আগে, গত ১৭ জুন (বুধবার) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্তই ছিল ইরানের বন্দর ও সমুদ্র উপকূল থেকে মার্কিন সামরিক অবরোধ প্রত্যাহার। চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিনের মাথাতেই সেই শর্ত কার্যকর করলো ওয়াশিংটন।
মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের পর এখন মূলত অপেক্ষা হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের অবরোধ তুলে নেওয়ার। তেহরানের পরমাণু প্রকল্প ঘিরে সৃষ্ট টানাপোড়েনের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করার দিনই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে ইরান। শুধু তাই নয়, অবরোধ আরও জোরদার করতে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালির বিভিন্ন স্থানে জলমাইনও পেতে রাখে ইরানি বাহিনী—যা এখনও কার্যকর রয়েছে।
সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তেহরানের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে ইরানের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহার কিংবা মাইন অপসারণ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা তথ্য আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অবশ্য আশাবাদী যে ইরান শিগগিরই হরমুজ ইস্যুতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান টানা দুই রাত হরমুজে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে কোনো ধরনের হামলা করা থেকে বিরত থেকেছে। এখন পর্যন্ত তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।"
ভ্যান্স আরও দাবি করেন, এই দুই রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্য যাচাই করতে না পারলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে—গত ২ দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩টি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ চলাচল করেছে, যার সম্মিলিত তেলের পরিমাণ ছিল ৬০ লাখ ব্যারেল।
বিশ্বের মোট জ্বালানিপণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয় এই কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই রুট দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৬০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস পরিবহন করা হতো।
ইরান এই প্রণালিতে অবরোধ জারি করার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর ব্যাঘাত ঘটে। ফলে একদিকে যেমন দেশে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে তেল ও গ্যাসের দাম।
জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার সিএনবিসিকে জানিয়েছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সমঝোতা চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ এবং সৎভাবে মেনে চলে—তাহলেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এবং যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় পৌঁছাতে কমপক্ষে আরও ২ মাস সময় লাগবে।

আপনার মতামত লিখুন