নজর বিডি
আপডেট : সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ও বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক কূটনীতি

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ও বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক কূটনীতি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি'র চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এমপি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বা দিল্লির পরিবর্তে কুয়ালালামপুরকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সুনিপুণ কৌশলগত ভারসাম্য (Strategic Equilibrium) বজায় রাখার প্রয়াস স্পষ্ট হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে শুরু হওয়া এই দুই দিনব্যাপী সফরের মূল চালিকাশক্তি হলো 'অর্থনৈতিক কূটনীতি' (Economic Diplomacy)। এটি দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার (South-South Cooperation) এক উজ্জ্বল অনুঘটক হিসেবে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও প্রগাঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়ার উপাচার্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আসিফ মিজান এই সফরকে বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বহুমাত্রিক কূটনীতির এক নতুন জয়যাত্রা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সফরের প্রধান প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আনুমানিক প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যা জাতীয় রেমিট্যান্স প্রবাহের অন্যতম মূল স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজারের পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভিসা জটিলতা নিরসন করে 'সিটিজেন টু... সিটিজেন' (C2C) আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি করা এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য। একই সাথে প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণ বৈধ ও নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে (Formal Channels) দেশে পাঠানোর জন্য ফিনটেক ও ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (১২.১৮ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত) পৌঁছেছে। তবে এই বাণিজ্যে মালয়েশিয়ার অনুকূলে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কমাতে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement - FTA) স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে 'টার্মস অব রেফারেন্স' (Terms of Reference) বিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল ইকোনমি (Halal Economy), জ্বালানি নিরাপত্তা ও আধুনিক কৃষিক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগের নতুন পথ উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট 'আসিয়ান'-এ বাংলাদেশের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হিসেবে অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য ব্লক 'আরসিইপি' (RCEP)-এ যোগদানের কূটনৈতিক তৎপরতায় মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন আদায় করা এই সফরের অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।

বর্তমানে অন্তত ১১,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষা খাতে এই অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম (Joint Degree) চালুর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সফরে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

মুসলিম বিশ্বের দুটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে ওআইসি (OIC), জাতিসংঘ এবং কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অবস্থান অভিন্ন। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে এবং কাউন্টার-টেররিজম রিসার্চসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় দুই দেশের গোয়েন্দা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি আশা করা যাচ্ছে।

কুয়ালালামপুরের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান চীনের ডালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যা তাঁর এই সফরের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজারের শৃঙ্খলা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সূচনা এবং আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার মাধ্যমে এই সফর দীর্ঘমেয়াদে 'সবার আগে বাংলাদেশ' বিনির্মাণের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ তারেক রহমান, প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ মালয়েশিয়া সম্পর্ক, প্রথম বিদেশ সফর, ভূ-অর্থনৈতিক কূটনীতি, শ্রমবাজার, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, আসিয়ান, আরসিইপি, রেমিট্যান্স, ড. আসিফ মিজান, সামার ডাভোস Tariq Rahman, Prime Minister, Bangladesh Malaysia Relations, First Foreign Visit, Geo-economic Diplomacy, Labor Market, FTA, ASEAN, RCEP, Remittance, Dr. Asif Mizan, Summer Davos

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ও বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক কূটনীতি

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি'র চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এমপি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বা দিল্লির পরিবর্তে কুয়ালালামপুরকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সুনিপুণ কৌশলগত ভারসাম্য (Strategic Equilibrium) বজায় রাখার প্রয়াস স্পষ্ট হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে শুরু হওয়া এই দুই দিনব্যাপী সফরের মূল চালিকাশক্তি হলো 'অর্থনৈতিক কূটনীতি' (Economic Diplomacy)। এটি দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার (South-South Cooperation) এক উজ্জ্বল অনুঘটক হিসেবে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও প্রগাঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়ার উপাচার্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আসিফ মিজান এই সফরকে বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বহুমাত্রিক কূটনীতির এক নতুন জয়যাত্রা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সফরের প্রধান প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আনুমানিক প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যা জাতীয় রেমিট্যান্স প্রবাহের অন্যতম মূল স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজারের পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভিসা জটিলতা নিরসন করে 'সিটিজেন টু... সিটিজেন' (C2C) আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি করা এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য। একই সাথে প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণ বৈধ ও নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে (Formal Channels) দেশে পাঠানোর জন্য ফিনটেক ও ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (১২.১৮ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত) পৌঁছেছে। তবে এই বাণিজ্যে মালয়েশিয়ার অনুকূলে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কমাতে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement - FTA) স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে 'টার্মস অব রেফারেন্স' (Terms of Reference) বিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল ইকোনমি (Halal Economy), জ্বালানি নিরাপত্তা ও আধুনিক কৃষিক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগের নতুন পথ উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট 'আসিয়ান'-এ বাংলাদেশের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হিসেবে অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য ব্লক 'আরসিইপি' (RCEP)-এ যোগদানের কূটনৈতিক তৎপরতায় মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন আদায় করা এই সফরের অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।

বর্তমানে অন্তত ১১,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষা খাতে এই অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম (Joint Degree) চালুর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সফরে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

মুসলিম বিশ্বের দুটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে ওআইসি (OIC), জাতিসংঘ এবং কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অবস্থান অভিন্ন। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে এবং কাউন্টার-টেররিজম রিসার্চসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় দুই দেশের গোয়েন্দা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি আশা করা যাচ্ছে।

কুয়ালালামপুরের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান চীনের ডালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যা তাঁর এই সফরের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজারের শৃঙ্খলা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সূচনা এবং আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার মাধ্যমে এই সফর দীর্ঘমেয়াদে 'সবার আগে বাংলাদেশ' বিনির্মাণের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত