নজর বিডি
প্রকাশ : সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ম্যারাডোনা: মাঠের জাদুকর থেকে মাঠের বাইরের এক বিপ্লবী

ম্যারাডোনা: মাঠের জাদুকর থেকে মাঠের বাইরের এক বিপ্লবী

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ফ্রাঙ্কো— কিংবদন্তি এই আর্জেন্টাইন জাদুকরকে ডাকা হয় ‘ফুটবল-ঈশ্বর’ নামে। তার প্রসঙ্গ এলে মাঠের সব জাদুকরী নৈপুণ্য আর বিতর্ক একইসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফুটবল, রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ– সবক্ষেত্রেই অনবদ্য অবদান ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী এই মহানায়কের।

১৯৬০ সালের অক্টোবরে আর্জেন্টিনার লানুসের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম ম্যারাডোনার। বুয়েনস আয়ার্সের দক্ষিণ উপকণ্ঠের প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠার মাঝেই মাত্র ৮ বছর বয়সে এক ট্যালেন্ট স্কাউটের নজরে পড়েন তিনি। ১২ বছর বয়সে বুয়েনস আয়ার্সের জুনিয়র দল 'লস সেবোলিটাস' এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে আর্জেন্টিনোস জুনিয়রর্সের হয়ে প্রিমেরা ডিভিশনে অভিষেক হয় তার। ক্লাবটির জার্সিতে ১৬৭ ম্যাচে করেন ১১৫ গোল।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ম্যারাডোনা দেশের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল করেন। ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসিই ফুটবলের ইতিহাসে কেবল দুই খেলোয়াড়, যাঁরা ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং সিনিয়র বিশ্বকাপ— দুই আসরেই গোল্ডেন বল জিতেছেন।

১৯৮২ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই ম্যারাডোনা বিতর্কের সূচনা করেন। ইতালির ক্লদিও জেন্টাইলের মারকুটে মার্কিংয়ের শিকার হয়েও উল্টো কার্ড দেখতে হয় তাকে। পরে ব্রাজিল ম্যাচে মেজাজ হারিয়ে জোয়াও বাতিস্তাকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন এই তরুণ।

তবে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল ম্যারাডোনার একক সাম্রাজ্য। পুরো আসরে একটি মুহূর্তের জন্যও বদলি না হয়ে ৫টি গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের জয়ে তিনি করেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল। ফরাসি পত্রিকা 'লেকিপ' তাকে আখ্যা দেয় ‘অর্ধেক ফেরেশতা, অর্ধেক শয়তান’।

প্রথম গোলটি হাত দিয়ে করেছিলেন ম্যারাডোনা। যা নিয়ে পরে তিনি বলেন, গোলটি হয়েছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ ২০০৫ সালে তিনি স্বীকার করেন, গোলটি ইচ্ছাকৃত ছিল।

একই ম্যাচে পাঁচ ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে করা দ্বিতীয় গোলটি ফিফার ভোটে 'শতকের সেরা গোল' নির্বাচিত হয়। এই গোল নিয়ে ম্যারাডোনা বলেন:

"সব শিশুই এরকম একটি গোল করার স্বপ্ন দেখে। এখনও বুঝি না সে আসলে কী করেছিল। মনে হয় তাকে কোনো ভূত বা ইউএফও নিচে নেমে এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পুরো গোলবার সে আমার জন্য একেবারে খুলে রেখেছিল।"

১৯৮২ বিশ্বকাপের পর রেকর্ড ৫০ লাখ পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন তিনি। তবে চোট ও অসুস্থতায় বার্সা অধ্যায় কাঙ্ক্ষিত সফল না হলেও তিনি ডেরা গড়েন ইতালির নাপোলিতে। তাঁর একক জাদুতে মরণাপন্ন নাপোলি ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে দ্বিতীয় লিগ শিরোপাসহ উয়েফা কাপ ও কোপা ইতালি জেতে। নাপোলি পরে ম্যারাডোনার প্রতি সম্মানে তাদের বিখ্যাত ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি চিরতরে অবসর ঘোষণা করে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়া ম্যারাডোনার জীবন ছিল কোকেন ও মাদকের অন্ধকারে মোড়ানো। তবে মাঠের বাইরে শোষিত ও বঞ্চিতদের পক্ষে তিনি ছিলেন এক উচ্চকণ্ঠ বিপ্লবী।

ম্যারাডোনা আজীবন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান।

কিউবার কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। নিজের বাঁ পায়ে ফিদেল কাস্ত্রো এবং ডান হাতে চে গুয়েভারার ট্যাটু আঁকিয়েছিলেন তিনি।

২০০৪ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেন এবং ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন।

লাতিন আবেগের শতভাগ ধারণ করা ম্যারাডোনার শেষ জীবন কেটেছে অনিয়ন্ত্রিত জীবন–যাপন ও নানাবিধ রোগে। একপর্যায়ে ওজন বেড়ে ২৮০ পাউন্ডে পৌঁছায়। ২০২০ সালে জরুরি মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র ১৩ দিন পর দুনিয়ার মায়া ছাড়েন এই কিংবদন্তি। তাঁর এই প্রয়াণে চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগে এখনও আদালতে মামলা চলমান। তবে মৃত্যু হলেও ফুটবল আর বিপ্লবের সমার্থক শব্দ হিসেবে ম্যারাডোনা বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনা ফুটবল, হ্যান্ড অব গড, ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, লিওনেল মেসি, নাপোলি, ফুটবল বিশ্বকাপ, ক্রীড়া সংবাদ, ফুটবল ঈশ্বর Diego Maradona, Argentina Football, Hand of God, 1986 World Cup, Fidel Castro, Che Guevara, Lionel Messi, Napoli, Football Legend, Sports News, Maradona Revolution

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ম্যারাডোনা: মাঠের জাদুকর থেকে মাঠের বাইরের এক বিপ্লবী

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ফ্রাঙ্কো— কিংবদন্তি এই আর্জেন্টাইন জাদুকরকে ডাকা হয় ‘ফুটবল-ঈশ্বর’ নামে। তার প্রসঙ্গ এলে মাঠের সব জাদুকরী নৈপুণ্য আর বিতর্ক একইসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফুটবল, রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ– সবক্ষেত্রেই অনবদ্য অবদান ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী এই মহানায়কের।

১৯৬০ সালের অক্টোবরে আর্জেন্টিনার লানুসের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম ম্যারাডোনার। বুয়েনস আয়ার্সের দক্ষিণ উপকণ্ঠের প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠার মাঝেই মাত্র ৮ বছর বয়সে এক ট্যালেন্ট স্কাউটের নজরে পড়েন তিনি। ১২ বছর বয়সে বুয়েনস আয়ার্সের জুনিয়র দল 'লস সেবোলিটাস' এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে আর্জেন্টিনোস জুনিয়রর্সের হয়ে প্রিমেরা ডিভিশনে অভিষেক হয় তার। ক্লাবটির জার্সিতে ১৬৭ ম্যাচে করেন ১১৫ গোল।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ম্যারাডোনা দেশের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল করেন। ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসিই ফুটবলের ইতিহাসে কেবল দুই খেলোয়াড়, যাঁরা ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং সিনিয়র বিশ্বকাপ— দুই আসরেই গোল্ডেন বল জিতেছেন।

১৯৮২ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই ম্যারাডোনা বিতর্কের সূচনা করেন। ইতালির ক্লদিও জেন্টাইলের মারকুটে মার্কিংয়ের শিকার হয়েও উল্টো কার্ড দেখতে হয় তাকে। পরে ব্রাজিল ম্যাচে মেজাজ হারিয়ে জোয়াও বাতিস্তাকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন এই তরুণ।

তবে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল ম্যারাডোনার একক সাম্রাজ্য। পুরো আসরে একটি মুহূর্তের জন্যও বদলি না হয়ে ৫টি গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের জয়ে তিনি করেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল। ফরাসি পত্রিকা 'লেকিপ' তাকে আখ্যা দেয় ‘অর্ধেক ফেরেশতা, অর্ধেক শয়তান’।

প্রথম গোলটি হাত দিয়ে করেছিলেন ম্যারাডোনা। যা নিয়ে পরে তিনি বলেন, গোলটি হয়েছিল ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ ২০০৫ সালে তিনি স্বীকার করেন, গোলটি ইচ্ছাকৃত ছিল।

একই ম্যাচে পাঁচ ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে করা দ্বিতীয় গোলটি ফিফার ভোটে 'শতকের সেরা গোল' নির্বাচিত হয়। এই গোল নিয়ে ম্যারাডোনা বলেন:

"সব শিশুই এরকম একটি গোল করার স্বপ্ন দেখে। এখনও বুঝি না সে আসলে কী করেছিল। মনে হয় তাকে কোনো ভূত বা ইউএফও নিচে নেমে এসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পুরো গোলবার সে আমার জন্য একেবারে খুলে রেখেছিল।"

১৯৮২ বিশ্বকাপের পর রেকর্ড ৫০ লাখ পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনায় যোগ দেন তিনি। তবে চোট ও অসুস্থতায় বার্সা অধ্যায় কাঙ্ক্ষিত সফল না হলেও তিনি ডেরা গড়েন ইতালির নাপোলিতে। তাঁর একক জাদুতে মরণাপন্ন নাপোলি ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে দ্বিতীয় লিগ শিরোপাসহ উয়েফা কাপ ও কোপা ইতালি জেতে। নাপোলি পরে ম্যারাডোনার প্রতি সম্মানে তাদের বিখ্যাত ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি চিরতরে অবসর ঘোষণা করে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়া ম্যারাডোনার জীবন ছিল কোকেন ও মাদকের অন্ধকারে মোড়ানো। তবে মাঠের বাইরে শোষিত ও বঞ্চিতদের পক্ষে তিনি ছিলেন এক উচ্চকণ্ঠ বিপ্লবী।

ম্যারাডোনা আজীবন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান।

কিউবার কমিউনিস্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ছিল গভীর বন্ধুত্ব। নিজের বাঁ পায়ে ফিদেল কাস্ত্রো এবং ডান হাতে চে গুয়েভারার ট্যাটু আঁকিয়েছিলেন তিনি।

২০০৪ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেন এবং ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন।

লাতিন আবেগের শতভাগ ধারণ করা ম্যারাডোনার শেষ জীবন কেটেছে অনিয়ন্ত্রিত জীবন–যাপন ও নানাবিধ রোগে। একপর্যায়ে ওজন বেড়ে ২৮০ পাউন্ডে পৌঁছায়। ২০২০ সালে জরুরি মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার মাত্র ১৩ দিন পর দুনিয়ার মায়া ছাড়েন এই কিংবদন্তি। তাঁর এই প্রয়াণে চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগে এখনও আদালতে মামলা চলমান। তবে মৃত্যু হলেও ফুটবল আর বিপ্লবের সমার্থক শব্দ হিসেবে ম্যারাডোনা বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত