লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার নিজ দলের ভেতরে তীব্র বিরোধের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, মাত্র এক দশকের ব্যবধানে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ব্রিটেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন কনজারভেটিভ পার্টি ঘন ঘন নেতা পরিবর্তনের যে প্রবণতা তৈরি করেছিল, লেবার পার্টির এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত যেন তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করল।
গত কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা ক্রমাগত তলানিতে ঠেকা এবং নিজ দলের এমপিদের প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে সোমবার (২২ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। ইতোমধ্যে লেবার পার্টির প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্টারমার সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি (টরি) পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে। শীর্ষ পদে ঘন ঘন এই পরিবর্তনের কারণে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই স্টারমার বারবার নেতা বদলের এই 'অরাজকতা' বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ দুই বছরেরও কম সময়ের মাথায় স্টারমার নিজেও একই ভাগ্যের পরিহাসে পড়লেন।
যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় পূর্বসূরী প্রধানমন্ত্রীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল,
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ডেভিড ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান ঘটায়। ২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইইউ ত্যাগের (ব্রেক্সিট) পক্ষে রায় দেওয়ার পর, ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো ক্যামেরন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ব্রেক্সিট গণভোটের পরবর্তী বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেন থেরেসা মে। ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে ২০১৭ সালে তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন, কিন্তু সেই চাল উল্টো ফল দেয় এবং তার দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরবর্তীতে পার্লামেন্টে নিজের ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ২০১৯ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে চরম পরাজয়ের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভদের এক বিশাল জয় এনে দিয়েছিলেন ছকভাঙা রাজনীতিবিদ বরিস জনসন। তাকে করোনাভাইরাস মহামারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের চূড়ান্ত বিদায়ের (ব্রেক্সিট) মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তবে 'পার্টিগেট'সহ একের পর এক কেলেঙ্কারিতে দুর্বল হয়ে পড়া জনসন শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের গণ-পদত্যাগের মুখে ক্ষমতা ছাড়েন।
বিপর্যয়কর কর ছাড়ের ‘মিনি-বাজেট’ পেশ করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের রেকর্ড। তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেশের শেয়ার ও মুদ্রাবাজারকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং যুক্তরাজ্যকে এক আর্থিক ধসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ফলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে বিদায় নেন তিনি।
লিজ ট্রাসের তৈরি করা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দায়িত্ব নিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও টরি দলের ভেতরের তিক্ত কোন্দল থামাতে ব্যর্থ হন ঋষি সুনাক। ব্যক্তিগতভাবে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক এই সাবেক অর্থায়নকারী শেষ পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে ভুগতে থাকা সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে পারেননি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে হেরে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
কনজারভেটিভদের হটিয়ে ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন লেবার পার্টির কিয়ার স্টারমার। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও নীতি নির্ধারণী কোন্দলের জেরে নিজ দলের ভেতরেই তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারান। অবশেষে গত কয়েক মাসের ক্রমাগত চাপের মুখে সোমবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
ঋষি সুনাক থেকে কিয়ার স্টারমার—এই পালাবদলের পর ১০ বছরের মাথায় সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার হাতে যাচ্ছে ব্রিটেনের শাসনভার, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
(সূত্র: এএফপি)
বিষয় : নজরবিডি সংবাদ যুক্তরাজ্যের রাজনীতি, কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, লেবার পার্টি, ব্রেক্সিট, ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ২০২৬ UK Politics, Keir Starmer Resigns, British Prime Minister, Labour Party, Brexit, David Cameron, Theresa May, Boris Johnson, Liz Truss, Rishi Sunak, International Politics 2026

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬
লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার নিজ দলের ভেতরে তীব্র বিরোধের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, মাত্র এক দশকের ব্যবধানে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে ব্রিটেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন কনজারভেটিভ পার্টি ঘন ঘন নেতা পরিবর্তনের যে প্রবণতা তৈরি করেছিল, লেবার পার্টির এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত যেন তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করল।
গত কয়েক মাস ধরে জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা ক্রমাগত তলানিতে ঠেকা এবং নিজ দলের এমপিদের প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে সোমবার (২২ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। ইতোমধ্যে লেবার পার্টির প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে নামবেন।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্টারমার সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি (টরি) পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করেছে। শীর্ষ পদে ঘন ঘন এই পরিবর্তনের কারণে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই স্টারমার বারবার নেতা বদলের এই 'অরাজকতা' বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ দুই বছরেরও কম সময়ের মাথায় স্টারমার নিজেও একই ভাগ্যের পরিহাসে পড়লেন।
যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় পূর্বসূরী প্রধানমন্ত্রীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল,
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ডেভিড ক্যামেরনের প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান ঘটায়। ২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকরা ইইউ ত্যাগের (ব্রেক্সিট) পক্ষে রায় দেওয়ার পর, ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো ক্যামেরন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ব্রেক্সিট গণভোটের পরবর্তী বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেন থেরেসা মে। ব্রেক্সিট আলোচনায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে ২০১৭ সালে তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন, কিন্তু সেই চাল উল্টো ফল দেয় এবং তার দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরবর্তীতে পার্লামেন্টে নিজের ব্রেক্সিট চুক্তি পাস করাতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ২০১৯ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে চরম পরাজয়ের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভদের এক বিশাল জয় এনে দিয়েছিলেন ছকভাঙা রাজনীতিবিদ বরিস জনসন। তাকে করোনাভাইরাস মহামারি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের চূড়ান্ত বিদায়ের (ব্রেক্সিট) মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তবে 'পার্টিগেট'সহ একের পর এক কেলেঙ্কারিতে দুর্বল হয়ে পড়া জনসন শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের গণ-পদত্যাগের মুখে ক্ষমতা ছাড়েন।
বিপর্যয়কর কর ছাড়ের ‘মিনি-বাজেট’ পেশ করে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের রেকর্ড। তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেশের শেয়ার ও মুদ্রাবাজারকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং যুক্তরাজ্যকে এক আর্থিক ধসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ফলে নিজ দলের সমর্থন হারিয়ে বিদায় নেন তিনি।
লিজ ট্রাসের তৈরি করা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দায়িত্ব নিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও টরি দলের ভেতরের তিক্ত কোন্দল থামাতে ব্যর্থ হন ঋষি সুনাক। ব্যক্তিগতভাবে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক এই সাবেক অর্থায়নকারী শেষ পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে ভুগতে থাকা সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে পারেননি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে হেরে কনজারভেটিভদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
কনজারভেটিভদের হটিয়ে ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন লেবার পার্টির কিয়ার স্টারমার। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও নীতি নির্ধারণী কোন্দলের জেরে নিজ দলের ভেতরেই তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারান। অবশেষে গত কয়েক মাসের ক্রমাগত চাপের মুখে সোমবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
ঋষি সুনাক থেকে কিয়ার স্টারমার—এই পালাবদলের পর ১০ বছরের মাথায় সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার হাতে যাচ্ছে ব্রিটেনের শাসনভার, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
(সূত্র: এএফপি)

আপনার মতামত লিখুন