পশ্চিম এশিয়ার ১০৭ দিনের সংঘাতের অবসান আধুনিক ভূরাজনীতির এক জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর সমঝোতা এবং পরবর্তী শান্তি চুক্তির রূপরেখা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও, এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী—ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। শশী থারুরের বিশ্লেষণে এই সংঘাতের কৌশলগত খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
কয়েক দশক ধরে ভারত 'জোটনিরপেক্ষ' নীতি ও সম্প্রতি 'বহু-জোটনীতি'র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ইরান, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল ভারতের কৌশলগত শক্তির ভিত্তি। তবে এই সংঘাতের চরম মুহূর্তে ভারতের মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফরের মতো বিষয়গুলো নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর ফলে ভারত তেহরানের কাছে নির্ভরযোগ্য সংলাপের অংশীদার হিসেবে নিজের বিশ্বস্ততা হারিয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারের সুযোগগুলো কিছুটা হলেও হাতছাড়া করেছে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তথাকথিত 'শান্তিদূত' হিসেবে আবির্ভূত হওয়াকে কেবল সুবিধাবাদী কূটনীতি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইসলামাবাদ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেনি; বরং এটি কাজ করেছে কেবল একটি নির্ভরযোগ্য বার্তা আদান-প্রদানকারী মাধ্যম বা ‘পোষা পায়রা’ হিসেবে।
ওয়াশিংটনের প্রতি পাকিস্তানের প্রদর্শনমূলক চাটুকারিতা এবং ভুলবশত ফাঁস হয়ে যাওয়া খসড়া বিবৃতি প্রমাণ করে যে, দেশটি স্বাধীন প্রভাব নয়, বরং মার্কিন কৃপা লাভের চেষ্টা করেছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষেরই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান সেই ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করেছে মাত্র, যা তাদের বৈশ্বিক রাষ্ট্রনায়কোচিত অবয়ব তৈরির একটি সুযোগ করে দিয়েছে।
এই ঘটনা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য স্পষ্ট শিক্ষা হলো: ১. ভারতের জন্য: প্রকৃত বহু-জোটনীতিতে ফিরে আসা জরুরি। পক্ষালম্বনকারী চরিত্র বিশ্বমঞ্চে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারতকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। ২. পাকিস্তানের জন্য: বৈশ্বিক মর্যাদার বিষয়ে নিজের অর্জনের বিভ্রম ঝেড়ে ফেলা উচিত। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সাময়িক সামরিক বা আর্থিক সুবিধা পাওয়া গেলেও তা পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানে যে, স্বাধীন মধ্যস্থতাকারী এবং পরাশক্তির সুবিধাজনক প্রতিনিধি—উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তাই ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের কল্পনা করাটা অলীক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ার ১০৭ দিনের সংঘাতের অবসান আধুনিক ভূরাজনীতির এক জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর সমঝোতা এবং পরবর্তী শান্তি চুক্তির রূপরেখা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও, এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী—ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। শশী থারুরের বিশ্লেষণে এই সংঘাতের কৌশলগত খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
কয়েক দশক ধরে ভারত 'জোটনিরপেক্ষ' নীতি ও সম্প্রতি 'বহু-জোটনীতি'র মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ইরান, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল ভারতের কৌশলগত শক্তির ভিত্তি। তবে এই সংঘাতের চরম মুহূর্তে ভারতের মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফরের মতো বিষয়গুলো নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর ফলে ভারত তেহরানের কাছে নির্ভরযোগ্য সংলাপের অংশীদার হিসেবে নিজের বিশ্বস্ততা হারিয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারের সুযোগগুলো কিছুটা হলেও হাতছাড়া করেছে।
এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের তথাকথিত 'শান্তিদূত' হিসেবে আবির্ভূত হওয়াকে কেবল সুবিধাবাদী কূটনীতি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইসলামাবাদ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেনি; বরং এটি কাজ করেছে কেবল একটি নির্ভরযোগ্য বার্তা আদান-প্রদানকারী মাধ্যম বা ‘পোষা পায়রা’ হিসেবে।
ওয়াশিংটনের প্রতি পাকিস্তানের প্রদর্শনমূলক চাটুকারিতা এবং ভুলবশত ফাঁস হয়ে যাওয়া খসড়া বিবৃতি প্রমাণ করে যে, দেশটি স্বাধীন প্রভাব নয়, বরং মার্কিন কৃপা লাভের চেষ্টা করেছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষেরই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে পিছু হটার জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান সেই ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করেছে মাত্র, যা তাদের বৈশ্বিক রাষ্ট্রনায়কোচিত অবয়ব তৈরির একটি সুযোগ করে দিয়েছে।
এই ঘটনা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য স্পষ্ট শিক্ষা হলো: ১. ভারতের জন্য: প্রকৃত বহু-জোটনীতিতে ফিরে আসা জরুরি। পক্ষালম্বনকারী চরিত্র বিশ্বমঞ্চে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারতকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। ২. পাকিস্তানের জন্য: বৈশ্বিক মর্যাদার বিষয়ে নিজের অর্জনের বিভ্রম ঝেড়ে ফেলা উচিত। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সাময়িক সামরিক বা আর্থিক সুবিধা পাওয়া গেলেও তা পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানে যে, স্বাধীন মধ্যস্থতাকারী এবং পরাশক্তির সুবিধাজনক প্রতিনিধি—উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তাই ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের কল্পনা করাটা অলীক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

আপনার মতামত লিখুন