নজর বিডি
প্রকাশ : রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

শহীদুল জহির বিতর্ক: বুদ্ধিবৃত্তিক পরশ্রীকাতরতার ব্যবচ্ছেদ

শহীদুল জহির বিতর্ক: বুদ্ধিবৃত্তিক পরশ্রীকাতরতার ব্যবচ্ছেদ

সম্প্রতি দেশসেরা একজন বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎকারে কথাশিল্পী শহীদুল জহিরকে 'তৃতীয় শ্রেণীর লেখক' হিসেবে আখ্যায়িত করার মন্তব্য নিয়ে সাহিত্য অঙ্গনে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীজানুর রহমান এক গভীর তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি একে কেবল সাধারণ সমালোচনা হিসেবে না দেখে ফ্রয়েড, লাকা ও আহমদ ছফার চিন্তাধারার আলোকে বাঙালির চিরন্তন 'পরশ্রীকাতর' মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

প্রবন্ধে অধ্যাপক মীজানুর রহমান দেখিয়েছেন, শহীদুল জহির তাঁর উপন্যাসে এই পরশ্রীকাতরতাকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের বৈভব দেখে গ্রামের মানুষের কুৎসা ও গুজবের যে পরিবেশ জহির এঁকেছিলেন, তা আজ বাস্তব জীবনে তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই ঘটছে।

অধ্যাপক মীজানুর রহমান এই প্রসঙ্গে আহমদ ছফার 'বাঙালি মুসলমানের মন' ও 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস'-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি বড় অংশ সুবিধাবাদী ও পরনিন্দুক। তিনি লিখেছেন, “নিজেরা বড় হতে পারে না বলিয়া, অন্য কেহ বড় হইলে তাহাকে টানিয়া নিচে নামাইবার এক সর্বগ্রাসী বাসনা এই সমাজকে তাড়িয়া ফেরে।” জহিরকে খারিজ করার এই প্রবণতা মূলত ছফার সেই পর্যবেক্ষণেরই পুনরাবৃত্তি।

প্রবন্ধে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘নার্সিসিজম অফ স্মল ডিফারেন্সেস’ বা ক্ষুদ্র পার্থক্যের অহমিকা তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সমগোত্রীয় অবস্থানে থাকা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখার অবচেতন তাড়না থেকেই অন্যের সৃজনশীলতাকে খাটো করার প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া জ্যাক লাকার ‘জুইস্যান্স’ (Jouissance) তত্ত্ব ব্যবহার করে লেখক দেখিয়েছেন, জহিরের গদ্যের নান্দনিক আনন্দ অনেক তাত্ত্বিকের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁরা জহিরকে 'ফোরক্লোজার' বা অস্বীকার করার মাধ্যমে সাহিত্যের বিচারের মানদণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন।

অধ্যাপক মীজানুর রহমানের মতে, জহিরকে 'তৃতীয় শ্রেণীর লেখক' বলে চাবুক মারার ভেতরেও এক ধরনের পঙ্কিল তৃপ্তি লুকিয়ে আছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে আহমদ ছফার অমোঘ বাক্যের পুনরাবৃত্তি করেন—বাঙালি গুণীর কদর করতে জানে না, তবে গুণী মারা গেলে শ্রাদ্ধ করতে ভালোবাসে। প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, তাত্ত্বিক ফতোয়া বা অন্ধ সমালোচনার মাধ্যমে শহীদুল জহিরের জাদুকরি গদ্যকে পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব; তাঁর সাহিত্য নিজ মহিমায় চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ শহীদুল জহির, অধ্যাপক মীজানুর রহমান, সাহিত্য বিতর্ক, আহমদ ছফা, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, বাঙালি সমাজ, সাহিত্য সমালোচনা।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


শহীদুল জহির বিতর্ক: বুদ্ধিবৃত্তিক পরশ্রীকাতরতার ব্যবচ্ছেদ

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি দেশসেরা একজন বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎকারে কথাশিল্পী শহীদুল জহিরকে 'তৃতীয় শ্রেণীর লেখক' হিসেবে আখ্যায়িত করার মন্তব্য নিয়ে সাহিত্য অঙ্গনে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীজানুর রহমান এক গভীর তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি একে কেবল সাধারণ সমালোচনা হিসেবে না দেখে ফ্রয়েড, লাকা ও আহমদ ছফার চিন্তাধারার আলোকে বাঙালির চিরন্তন 'পরশ্রীকাতর' মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

প্রবন্ধে অধ্যাপক মীজানুর রহমান দেখিয়েছেন, শহীদুল জহির তাঁর উপন্যাসে এই পরশ্রীকাতরতাকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসে মফিজউদ্দিনের বৈভব দেখে গ্রামের মানুষের কুৎসা ও গুজবের যে পরিবেশ জহির এঁকেছিলেন, তা আজ বাস্তব জীবনে তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই ঘটছে।

অধ্যাপক মীজানুর রহমান এই প্রসঙ্গে আহমদ ছফার 'বাঙালি মুসলমানের মন' ও 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস'-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি বড় অংশ সুবিধাবাদী ও পরনিন্দুক। তিনি লিখেছেন, “নিজেরা বড় হতে পারে না বলিয়া, অন্য কেহ বড় হইলে তাহাকে টানিয়া নিচে নামাইবার এক সর্বগ্রাসী বাসনা এই সমাজকে তাড়িয়া ফেরে।” জহিরকে খারিজ করার এই প্রবণতা মূলত ছফার সেই পর্যবেক্ষণেরই পুনরাবৃত্তি।

প্রবন্ধে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘নার্সিসিজম অফ স্মল ডিফারেন্সেস’ বা ক্ষুদ্র পার্থক্যের অহমিকা তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সমগোত্রীয় অবস্থানে থাকা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখার অবচেতন তাড়না থেকেই অন্যের সৃজনশীলতাকে খাটো করার প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া জ্যাক লাকার ‘জুইস্যান্স’ (Jouissance) তত্ত্ব ব্যবহার করে লেখক দেখিয়েছেন, জহিরের গদ্যের নান্দনিক আনন্দ অনেক তাত্ত্বিকের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁরা জহিরকে 'ফোরক্লোজার' বা অস্বীকার করার মাধ্যমে সাহিত্যের বিচারের মানদণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন।

অধ্যাপক মীজানুর রহমানের মতে, জহিরকে 'তৃতীয় শ্রেণীর লেখক' বলে চাবুক মারার ভেতরেও এক ধরনের পঙ্কিল তৃপ্তি লুকিয়ে আছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে আহমদ ছফার অমোঘ বাক্যের পুনরাবৃত্তি করেন—বাঙালি গুণীর কদর করতে জানে না, তবে গুণী মারা গেলে শ্রাদ্ধ করতে ভালোবাসে। প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, তাত্ত্বিক ফতোয়া বা অন্ধ সমালোচনার মাধ্যমে শহীদুল জহিরের জাদুকরি গদ্যকে পাঠকের মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব; তাঁর সাহিত্য নিজ মহিমায় চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত