নজর বিডি
প্রকাশ : রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

১৯ জুলাই : কারফিউ-সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেটহীন দেশে ছিল মৃত্যু উপত্যকা

১৯ জুলাই : কারফিউ-সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেটহীন দেশে ছিল মৃত্যু উপত্যকা

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত ও ভয়াবহ দিনগুলোর একটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির এই দিনে রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। 

দিনভর সহিংসতায় দেশজুড়ে অন্তত ৫৬ জন নিহত হন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রবাহ সীমিত করতে পাঁচ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পর, ওই দিন রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

১৮ জুলাই দেশজুড়ে শতাধিক প্রাণহানির পর ১৯ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিপীড়ন আরও নির্মম হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দিনভর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। 

আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ মানুষের ঢল নামে। ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে মিনিটে মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা ও সিএনজিতে করে সব বয়সী আহত-নিহতদের আনা হয়, যেখানে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খান চিকিৎসকেরা।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকেই রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী থেকে শুরু করে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা, মহাখালী, প্রেসক্লাব ও পল্টন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। 

ঢাকার বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটক করা হয়।

সহিংসতার মধ্যে রামপুরা থানা, মিরপুরের পাঁচটি পুলিশ বক্স, বনানীতে বিআরটিএ-এর সদর কার্যালয় এবং মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে ভাঙচুরের কারণে মেট্রোরেলসহ সারা দেশের সঙ্গে রেল ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

বাতিল করা হয় একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠলেও র‍্যাব দাবি করে, তারা কেবল আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কাজ চালিয়েছে।

এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তৎকালীন সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহসহ প্রতিনিধিরা। 

বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল নরসিংদী জেলা কারাগারে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা। কারাগারের গেট ভেঙে জঙ্গি সদস্যসহ মোট ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। 

সব মিলিয়ে, কারফিউ, সেনা মোতায়েন, দেশব্যাপী প্রাণহানি এবং আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক রূপরেখা উত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বিষয় : নজরবিডি সংবাদ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


১৯ জুলাই : কারফিউ-সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেটহীন দেশে ছিল মৃত্যু উপত্যকা

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত ও ভয়াবহ দিনগুলোর একটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির এই দিনে রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। 

দিনভর সহিংসতায় দেশজুড়ে অন্তত ৫৬ জন নিহত হন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রবাহ সীমিত করতে পাঁচ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পর, ওই দিন রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

১৮ জুলাই দেশজুড়ে শতাধিক প্রাণহানির পর ১৯ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিপীড়ন আরও নির্মম হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দিনভর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। 

আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলে হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ মানুষের ঢল নামে। ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে মিনিটে মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা ও সিএনজিতে করে সব বয়সী আহত-নিহতদের আনা হয়, যেখানে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খান চিকিৎসকেরা।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকেই রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী থেকে শুরু করে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা, মহাখালী, প্রেসক্লাব ও পল্টন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। 

ঢাকার বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, বরিশাল ও গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটক করা হয়।

সহিংসতার মধ্যে রামপুরা থানা, মিরপুরের পাঁচটি পুলিশ বক্স, বনানীতে বিআরটিএ-এর সদর কার্যালয় এবং মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে ভাঙচুরের কারণে মেট্রোরেলসহ সারা দেশের সঙ্গে রেল ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

বাতিল করা হয় একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠলেও র‍্যাব দাবি করে, তারা কেবল আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কাজ চালিয়েছে।

এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তৎকালীন সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহসহ প্রতিনিধিরা। 

বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাটডাউন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

দিনটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল নরসিংদী জেলা কারাগারে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা। কারাগারের গেট ভেঙে জঙ্গি সদস্যসহ মোট ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়। 

সব মিলিয়ে, কারফিউ, সেনা মোতায়েন, দেশব্যাপী প্রাণহানি এবং আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক রূপরেখা উত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।


নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত