নজর বিডি

ক্ষমা ও বরকতের রজনী শবে বরাত

ক্ষমা ও বরকতের রজনী শবে বরাত

যা আমাদের সমাজে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত...


মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি অপরিসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি বান্দার সামান্য অনুতাপ ও তাওবার বিনিময়েও ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময় ও স্থানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে গুনাহগার বান্দারা ফিরে এসে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে। এসব বরকতময় সময়ের অন্যতম হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা আমাদের সমাজে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত।   কোরআনুল কারিমে এ রাতকে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ অর্থাৎ বরকতময় রাত বলা হয়েছে। আর হাদিস শরিফে একে ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে একটি শ্রেণি বিরোধিতার বশবর্তী হয়ে শবে বরাতের ফজিলত ও তাৎপর্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করে থাকে এবং এ রাতের সব আমলকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করে। অথচ বাস্তবতা হলো—কোরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিসে শবে বরাতের মর্যাদা, ফজিলত এবং করণীয় সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। নিম্নে সংক্ষেপে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
ক্ষমা ও রহমতের বিশেষ রাত
হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— “শাবান মাসের অর্ধরাতে (১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫; আল মু’জামুল কাবীর ২০/১০৯; শুআবুল ইমান, হা. ৬৬২৮) অষ্টম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। (মাজমাউজ জাওয়াইদ ৮/৬৫) এ বিষয়বস্তুর হাদিস হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আবু মুসা আশআরি (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), হজরত আয়েশা (রা.)সহ একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুল (সা.)-এর শবে বরাতের ইবাদত
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় ধরে সিজদায় ছিলেন। আমি ভয়ে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলে তিনি নড়লেন। নামাজ শেষে তিনি বলেন— “হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজ কোন রাত?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, “এটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন, ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, তবে হিংসুকদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।” (শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫) ইমাম বায়হাকি (রহ.) এ হাদিসকে উত্তম মুরসাল হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শবে বরাতে ইবাদত ও রোজার নির্দেশনা
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- “শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাত এলে তোমরা রাতটি ইবাদতের মাধ্যমে পালন করো এবং পরদিন রোজা রাখো। কেননা সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে অবতরণ করে বলেন— কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দেব। কোনো রোগাক্রান্ত আছে কি? আমি তাকে আরোগ্য দান করব।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮) হাদিসটি ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য বলে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে হিব্বান, ইবনে রজব হাম্বলি ও ইবনে তাইমিয়া (রহ.)সহ বহু হাদিস বিশারদ শবে বরাত সংক্রান্ত হাদিসসমূহকে সমষ্টিগতভাবে বিশুদ্ধ বলেছেন।
ভাগ্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ রাত
আল্লাহ তায়ালা বলেন— “নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। এই রাতেই প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।” (সুরা দুখান: ২-৩) কিছু তাফসিরকার শবে কদরের কথা বললেও একাধিক মুফাসসিরের মতে, এখানে শবে বরাতের কথাও অন্তর্ভুক্ত। ইকরামা (রহ.) সূত্রে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “অর্ধ শাবানের রাতে সারা বছরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং শবে কদরে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।” (তাফসিরে কুরতুবি ১৬/১২৬) হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এ রাতে মানুষের জন্ম-মৃত্যু, আমল ও রিজিকের হিসাব লিপিবদ্ধ করা হয়। (ফাজায়েলে আওক্বাত, বায়হাকি, হা. ২৬)
শবে বরাতের করণীয় আমল
এ রাতে বেশি বেশি তাসবিহ-তাহলিল, ইসতিগফার, দরুদ শরিফ, কোরআন তেলাওয়াত করা উত্তম। নিজের গুনাহের জন্য আন্তরিক তাওবা করা, নফল ও কাজা নামাজ আদায় করা, আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। কবর জিয়ারতেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে শবে বরাতের ফজিলত উপলব্ধি করে সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করেন—আমিন।

নজর ইসলামিক ডেস্ক


 

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
নজর বিডি

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


ক্ষমা ও বরকতের রজনী শবে বরাত

প্রকাশের তারিখ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

যা আমাদের সমাজে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত...


মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি অপরিসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি বান্দার সামান্য অনুতাপ ও তাওবার বিনিময়েও ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন সময় ও স্থানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে গুনাহগার বান্দারা ফিরে এসে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারে। এসব বরকতময় সময়ের অন্যতম হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা আমাদের সমাজে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত।   কোরআনুল কারিমে এ রাতকে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ অর্থাৎ বরকতময় রাত বলা হয়েছে। আর হাদিস শরিফে একে ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে একটি শ্রেণি বিরোধিতার বশবর্তী হয়ে শবে বরাতের ফজিলত ও তাৎপর্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করে থাকে এবং এ রাতের সব আমলকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করে। অথচ বাস্তবতা হলো—কোরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিসে শবে বরাতের মর্যাদা, ফজিলত এবং করণীয় সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। নিম্নে সংক্ষেপে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
ক্ষমা ও রহমতের বিশেষ রাত
হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— “শাবান মাসের অর্ধরাতে (১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫; আল মু’জামুল কাবীর ২০/১০৯; শুআবুল ইমান, হা. ৬৬২৮) অষ্টম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। (মাজমাউজ জাওয়াইদ ৮/৬৫) এ বিষয়বস্তুর হাদিস হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আবু মুসা আশআরি (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), হজরত আয়েশা (রা.)সহ একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুল (সা.)-এর শবে বরাতের ইবাদত
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় ধরে সিজদায় ছিলেন। আমি ভয়ে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলে তিনি নড়লেন। নামাজ শেষে তিনি বলেন— “হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজ কোন রাত?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, “এটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন, ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, তবে হিংসুকদের তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন।” (শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫) ইমাম বায়হাকি (রহ.) এ হাদিসকে উত্তম মুরসাল হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শবে বরাতে ইবাদত ও রোজার নির্দেশনা
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- “শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাত এলে তোমরা রাতটি ইবাদতের মাধ্যমে পালন করো এবং পরদিন রোজা রাখো। কেননা সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে অবতরণ করে বলেন— কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দেব। কোনো রোগাক্রান্ত আছে কি? আমি তাকে আরোগ্য দান করব।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮) হাদিসটি ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য বলে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে হিব্বান, ইবনে রজব হাম্বলি ও ইবনে তাইমিয়া (রহ.)সহ বহু হাদিস বিশারদ শবে বরাত সংক্রান্ত হাদিসসমূহকে সমষ্টিগতভাবে বিশুদ্ধ বলেছেন।
ভাগ্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ রাত
আল্লাহ তায়ালা বলেন— “নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। এই রাতেই প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।” (সুরা দুখান: ২-৩) কিছু তাফসিরকার শবে কদরের কথা বললেও একাধিক মুফাসসিরের মতে, এখানে শবে বরাতের কথাও অন্তর্ভুক্ত। ইকরামা (রহ.) সূত্রে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “অর্ধ শাবানের রাতে সারা বছরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং শবে কদরে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।” (তাফসিরে কুরতুবি ১৬/১২৬) হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এ রাতে মানুষের জন্ম-মৃত্যু, আমল ও রিজিকের হিসাব লিপিবদ্ধ করা হয়। (ফাজায়েলে আওক্বাত, বায়হাকি, হা. ২৬)
শবে বরাতের করণীয় আমল
এ রাতে বেশি বেশি তাসবিহ-তাহলিল, ইসতিগফার, দরুদ শরিফ, কোরআন তেলাওয়াত করা উত্তম। নিজের গুনাহের জন্য আন্তরিক তাওবা করা, নফল ও কাজা নামাজ আদায় করা, আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। কবর জিয়ারতেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে শবে বরাতের ফজিলত উপলব্ধি করে সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করেন—আমিন।

নজর ইসলামিক ডেস্ক


 

নজর বিডি

উপদেষ্টা সম্পাদক: মো: ইব্রাহিম খলিল। 
সম্পাদক: মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। 
লিগ্যাল এডভাইজার: মাহমুদুর রহমান সুইট- এম.কম, এল এল বি, এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।


 

কপিরাইট © ২০২৬ নজর বিডি সর্বস্ব সংরক্ষিত